করুণ পরিণতির ইতিহাস : ক্ষমতার মসনদ থেকে মৃত্যুদণ্ড

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মানবসভ্যতার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন বহু মুহূর্ত রয়েছে, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেতারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের দেশের আইনি কাঠামোর মধ্যেই মৃত্যুদণ্ড

2025-11-17T21:41:41+00:00
2025-11-17T21:41:41+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
করুণ পরিণতির ইতিহাস : ক্ষমতার মসনদ থেকে মৃত্যুদণ্ড
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫, ৯:৪১ পিএম 
এসব পরিণতি রাষ্ট্রক্ষমতার সীমা ও জনগণের রোষের গভীরতম প্রতিচ্ছবি হয়ে রয়ে গেছে। প্রতীকী ছবি
মানবসভ্যতার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন বহু মুহূর্ত রয়েছে, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেতারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের দেশের আইনি কাঠামোর মধ্যেই মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন, অথবা অভ্যুত্থান-বিপ্লবের অস্থিরতায় চরম পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন। রাজনৈতিক বৈধতা হারানো, গণ-অসন্তোষ, যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক জটিলতা বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ; পরিস্থিতি যেমনই হোক, এসব পরিণতি রাষ্ট্রক্ষমতার সীমা ও জনগণের রোষের গভীরতম প্রতিচ্ছবি হয়ে রয়ে গেছে। 

নিচে এমন কয়েকজন নেতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো, যাদের ক্ষমতার শীর্ষ থেকে পতন ঘটেছে মৃত্যুদণ্ড বা মৃত্যুর অনিবার্য পরিস্থিতিতে।

ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লস : ১৭শ শতকের ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র ও পার্লামেন্টের বিরোধ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। চার্লস প্রথম সংসদকে পাশ কাটিয়ে কর আরোপ ও কর্তৃত্ব বিস্তারের চেষ্টা করলে অসন্তোষ বাড়ে। পার্লামেন্টারি বাহিনীর কাছে পরাজয়ের পর তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিশেষ আদালত ‘জনগণের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। দীর্ঘ আইনি বিতর্ক পেরিয়ে ১৬৪৯ সালে তাকে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করা হয়। এটি ছিল ইউরোপে প্রথম ঘটনা যেখানে নিজের দেশের আদালত একজন রাজাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়; যা রাজকীয় ক্ষমতা সীমিত করার নতুন পথ খুলে দেয়।

ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই : অর্থনৈতিক সংকট, করের চাপ ও অভিজাত সুবিধাবাদ নিয়ে জনরোষ চরমে উঠতেই ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়। বিপ্লবীরা ক্ষমতা নেওয়ার পর লুই ষোড়শের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশ ও বিপ্লব নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনে। জাতীয় কনভেনশনের ভোটে তার মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন হয়। ১৭৯৩ সালে গিলোটিনে তার শিরশ্ছেদ ঘটে। রাজতন্ত্রের পতন ও প্রজাতন্ত্রের উত্থানকে স্থায়ীভাবে প্রতীকায়িত করে।

হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ইমরে ন্যাগি : ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে জনবিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন ন্যাগি। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সোভিয়েত ব্লক থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিলে মস্কো কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায়। সোভিয়েত সেনা অভিযানের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। গোপন ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রদ্রোহ ও ক্ষমতা উৎখাতের অভিযোগে ১৯৫৮ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ন্যাগি পরে হাঙ্গেরির মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন এবং ১৯৮৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বাসিত হন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো : ১৯৭৭ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। পরে এক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করে। সব আপিল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ১৯৭৯ সালে ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়া হয়। পাকিস্তানের রাজনীতিতে এ ঘটনা স্থায়ী বিভক্তি তৈরি করে এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব আরও জোরালো হয়।

রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকোলাই চাউশেস্কু : দীর্ঘদিনের দমনমূলক ও ব্যক্তিপূজামূলক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৮৯ সালে রোমানিয়ায় জনবিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। সেনাবাহিনী তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে চাউশেস্কু পালানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ধরা পড়েন। এক দ্রুত সামরিক ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ও তার স্ত্রীকে গুলি করা হয়। পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট যুগের অবসানের অন্যতম প্রতীক হয়ে রয়ে যায় এ ঘটনা।

ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন : মার্কিন আগ্রাসনের পর সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেফতার করে ইরাকের নতুন সরকার। ১৯৮২ সালে দুজাইল শহরে শিয়া নাগরিকদের গণহত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়। দীর্ঘ বিচার শেষে ২০০৬ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। যদিও কেউ এটিকে ন্যায়বিচার মনে করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকেই এটিকে ‘বিজয়ীর বিচার’ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তবু এই বিচার ইরাকে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করে।

চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দে : সালভাদোর আলেন্দে লাতিন আমেরিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মার্কসবাদী প্রেসিডেন্ট। কিন্তু ১৯৭৩ সালে জেনারেল অগুস্তো পিনোশের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান হলে আলেন্দে ক্ষমতা হারান। অভ্যুত্থানের সময় তিনি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে অবস্থান করছিলেন। সেনাবাহিনী বেষ্টনী ও বোমাবর্ষণের মধ্যে তার মৃত্যু ঘটে; পরে আনুষ্ঠানিক তদন্তে তাকে আত্মহত্যা করেছেন বলা হয়, যদিও এই ব্যাখ্যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। সরাসরি মৃত্যুদণ্ড নয়, কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অবস্থাতেই তার মৃত্যু ঘটে; যা মার্কিন শীতল যুদ্ধ-রাজনীতির প্রভাব, সিআইএয়ের জড়িত থাকার অভিযোগ ও লাতিন আমেরিকার সামরিক একনায়কতন্ত্রের উত্থানকে ঘিরে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়।

জেডও/



  বিষয়:   হাসিনা  খুনি হাসিনা  ফ্যাসিস্ট  আদালত  ফাঁসি  রায়  বিচার  বিচারক  মানবতাবিরোধী অপরাধ  গণহত্যা  ক্ষমতার মসনদ  ইতিহাস 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: