মারা গেলেন আমেরিকার তুলসা গণহত্যার একমাত্র সাক্ষী

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

আমেরিকার ভয়াবহ তুলসা গণহত্যার সাক্ষীদের মধ্যে একজন ছিলেন ভায়োলা ফোর্ড ফ্লেচার, যিনি সম্প্রতি ১১১ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যু

2025-11-25T12:24:58+00:00
2025-11-25T12:45:22+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মারা গেলেন আমেরিকার তুলসা গণহত্যার একমাত্র সাক্ষী
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:২৪ পিএম  আপডেট: ২৫.১১.২০২৫ ১২:৪৫ পিএম
২০২৩ সালের জুনে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কথা বলেন তুলসা গণহত্যায় বেঁচে থাকা সাক্ষী ভায়োলা ফোর্ড ফ্লেচার। ছবি : এপি
আমেরিকার ভয়াবহ তুলসা গণহত্যার সাক্ষীদের মধ্যে একজন ছিলেন ভায়োলা ফোর্ড ফ্লেচার, যিনি সম্প্রতি ১১১ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যু এক গভীর শোকের কারণ। তার কর্ম এবং সংগ্রামের ইতিহাস কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনে অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছে। তিনি তার জীবদ্দশায় সেই ভয়াবহ ঘটনার শুধু একমাত্র সাক্ষী হিসেবেই নয় বরং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ন্যায় এবং সুবিচারের আদর্শ হিসেবেও বেঁচে থাকবেন। তিনি তার দীর্ঘ জীবনকে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ে ত্যাগ করেছেন। 

১৯২১ সালের গণহত্যা

১৯২১ সালের ৩১ মে, তুলসা শহরের ‘বিশ্বের সবচেয়ে ধনী কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের জেলা’ হিসেবে পরিচিত গ্রিনউড জেলা, এক ভয়ঙ্কর ঘটনার শিকার হয়। ফ্লেচার তখন মাত্র সাত বছর বয়সে ছিলেন। সেই সময় পুলিশ ১৯ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ ডিক রোল্যান্ডকে গ্রেফতার করে, এক শেতাঙ্গ নারীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে। শেতাঙ্গ  সম্প্রদায়ের জনগণ তখন রোল্যান্ডের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি এক সময় এমন চরমে পৌঁছায় যে, কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ও রোল্যান্ডকে রক্ষার জন্য রাস্তায় নেমে আসে, এবং উভয় পক্ষের মধ্যে সহিংসতা শুরু হয়।

মাত্র দু’দিনের মধ্যে গ্রিনউড জেলা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়—লুটপাট, আগুন, এবং হত্যাযজ্ঞের মধ্যে প্রায় ৩০০ মানুষ প্রাণ হারায়। হাজার হাজার মানুষের জীবিকা শেষ হয়ে যায়, এবং বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে,  গণহত্যার চিত্র শুধু মৃতের সংখ্যা গণনা করা নয়, এটি একটি জাতিগত সহিংসতা, নিপীড়ন এবং অমিমাংসিত ন্যায়ের ভয়াবহতাকে তুলে ধরে। 

ফ্লেচারের সংগ্রামী জীবন

তুলসা গণহত্যার পর, ফ্লেচারের পরিবারকে ভূমিহীন ও অভাবী হয়ে পড়তে হয়। কৃষ্ণাঙ্গ শেয়ারক্রপিং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছিল। তবে, এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ভায়োলা ফোর্ড ফ্লেচার কখনোই হার মানেননি। তিনি জানতেন, শুধুমাত্র ইতিহাসের কাছে সত্য প্রতিষ্ঠিত হলেই তার পরিবারের ক্ষতি পূর্ণ হবে, সেই সঙ্গে জাতিও এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে। 

১৯৯৭ সালে, ওকলাহোমা রাজ্য তুলসা গণহত্যার তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করেছিল, কিন্তু তখনো সারা দেশে এই ঘটনার গুরুত্ব এবং পরিণতি সেভাবে উপলব্ধি হয়নি। ২০০১ সালে, ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন ওঠে, কিন্তু আইনগত বাধা এবং আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

ফ্লেচারের সংগ্রাম তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২১ সালে, তুলসা গণহত্যার শতবর্ষে, তিনি মার্কিন কংগ্রেসে গিয়ে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। সেখানেই তিনি সবার সামনে বলেছিলেন, আমাদের ইতিহাস কখনও ভুলে যাওয়ার নয়। আমরা শুধু ক্ষতিপূরণ চাই না, আমরা চাই ন্যায় এবং সত্য স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইবে। তখন তার এ সাহসী বক্তৃতা এবং লড়াইয়ের আহ্বান দেশের রাজনীতিবিদদের হৃদয় স্পর্শ করে। 

এছাড়া ২০২৩ সালে, তিনি তার নাতির সঙ্গে যৌথভাবে একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন, যার নাম ছিল "Don't Let Them Bury My Story" (আমার ঘটনাকে কবর দিতে দিও না)। এই বইটি ছিল শুধু তার আত্মজীবনীই নয়, বরং গণহত্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায়বিচারের এক অমোচনীয় দাবি।

ফ্লেচারের মৃত্যুর পর

ভায়োলা ফোর্ড ফ্লেচারের মৃত্যু শুধু তার পরিবার বা তুলসা শহরের জন্য নয়, পুরো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গভীর শোকের মুহূর্ত। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা টুইটারে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন, ভায়োলা ফোর্ড ফ্লেচার ছিলেন তুলসা গণহত্যার জীবন্ত ইতিহাস, যিনি তার সংগ্রামের গল্প জানানোর মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, ইতিহাস কখনও ভুলে যাওয়ার নয়। মিশেল এবং আমি তার সিভিল রাইটস আন্দোলনে অবদানের জন্য চিরকাল কৃতজ্ঞ। তার পরিবারকে আমাদের ভালোবাসা জানাই।

ফ্লেচারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এক যুগের পরিসমাপ্তি ঘটলেও তার লড়াই, সংগ্রাম এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ চলমান থাকবে। তিনি শুধু একজন জীবন্ত সাক্ষী ছিলেন না, ছিলেন অবিচলিত যোদ্ধা, যিনি আমেরিকাকে তার অন্ধকার ইতিহাস ভুলে না গিয়ে, সঠিক পথে হাঁটতে শেখালেন।

তার জীবন থেকে শিক্ষা

ভায়োলা ফোর্ড ফ্লেচারের জীবন এক গভীর শিক্ষা প্রদান করে। একটি জাতি কখনোই তার ইতিহাসের মর্মান্তিক সত্যকে এড়িয়ে যেতে পারে না। তার লড়াই আমাদের দেখিয়ে দেয়, যে জাতি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সে জাতিকে একে একে সব সত্যের সম্মুখীন হতে হয়। বিষয়টি যতোই কষ্টকর ও যন্ত্রণাদায়ক হোক না কেন। তার জীবন, তার সংগ্রাম এবং তার উত্তরাধিকার আজও বেঁচে থাকবে জাতির মধ্যে। 


আল-জাজিরার প্রতিবেদন অবলম্বনে অনুবাদ : মারিয়া হাসিবা

/ইউএমএইচ








  বিষয়:   আমেরিকা  তুলসা গণহত্যা  একমাত্র সাক্ষী 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: