এশিয়ার দেশে দেশে দুর্যোগের ঘনঘটা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

এশিয়ার দেশে দেশে আঘাত হানছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এখানে বন্যা, ওখানে টাইফুন তো আরেক জায়গায় ভূমিকম্প। মৌসুমি বায়ুর অস্বাভাবিক আচরণ, লা

2025-11-27T23:50:38+00:00
2025-11-27T23:50:38+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
এশিয়ার দেশে দেশে দুর্যোগের ঘনঘটা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫, ১১:৫০ পিএম 
বন্যায় ভয়াবহ এক অধ্যায়ের সাক্ষী হলো শ্রীলঙ্কা। ছবি : সংগৃহীত
এশিয়ার দেশে দেশে আঘাত হানছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এখানে বন্যা, ওখানে টাইফুন তো আরেক জায়গায় ভূমিকম্প। মৌসুমি বায়ুর অস্বাভাবিক আচরণ, লা নিনার প্রভাব, আর দীর্ঘদিনের জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ এই তিনের মিলিত আঘাতে অঞ্চলজুড়ে বন্যা ও ভূমিধস যেন একের পর এক চক্রাকারে দেখা দিচ্ছে। প্রায় দেশেই মানুষ ঘরছাড়া, রাস্তা ভাঙা, বিদ্যুৎহীন এলাকা আর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমির একই গল্প।

শুরু করা যাক শ্রীলঙ্কা দিয়ে। দেশের মধ্য ও পাহাড়ি এলাকায় টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত মাটি এতটাই নরম করে ফেলেছে যে একের পর এক ভূমিধস হয়েছে। পুরো গ্রাম ধসে গেছে; বাড়িঘর, ছোট দোকান, চা-বাগান সব কিছু কাদার নিচে চাপা পড়েছে। মৃত ও নিখোঁজ মিলিয়ে সংখ্যাটা বাড়তেই থাকে। অনেক পরিবার এমন অবস্থায় পড়েছে যেখানে নিজেদের ঘরের চিহ্নও খুঁজে পাচ্ছে না। রাস্তাঘাট ধসে যাওয়ায় উদ্ধারদল বহু এলাকায় পৌঁছাতে পারেনি ফলে অনেক অসুস্থ, আহত কিংবা বয়স্ক মানুষ বিপজ্জনক অবস্থায় আটকে আছেন। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সামরিক বাহিনীও উদ্ধারকাজে নেমেছে কিন্তু আবহাওয়া বারবার বাধা দিচ্ছে। এপি নিউজ জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টিপাতে ভূমিধস ও বন্যায় অন্তত ৩১ জন নিহত, ১৪ জন নিখোঁজ। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার চার হাজারের বেশি। রেল ও সড়ক বন্ধ রাখতে হয়েছে, পাহাড়ি অঞ্চলে ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা অঞ্চলেও চিত্রটা খুব ভিন্ন নয়। সেখানেও টানা বৃষ্টির সঙ্গে নেমেছে আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ি ঢলে ভূমিধস। ছোট ছোট গ্রামগুলো মুহূর্তে পানির নিচে চলে গেছে। বাড়ির ভেতর পানি উঠে যাওয়ায় মানুষ কোনো রকমে উঁচু বাঁধে বা স্কুল-কলেজে আশ্রয় নিয়েছে। বহু জেলা প্রশাসক এখনও সঠিকভাবে জানেন না কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ অনেক জায়গা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ কেবল অনুমান করা যায়।

ভূমিকম্পে দেবে যাওয়া ইন্দোনেশিয়ার একটি সড়কের দৃশ্য

মালয়েশিয়ার কয়েকটি রাজ্যেও নদীগুলো হঠাৎ উপচে পড়েছে। পানি এত দ্রুত বেড়েছে যে বহু পরিবার রাতারাতি বাড়ি ছেড়ে বের হতে বাধ্য হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে জায়গা কমে গেছে, গাদাগাদি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে পরিবারগুলো। বাজার-ঘাট, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল- স্বাভাবিক সব সেবা ব্যাহত হয়েছে। বন্যার কারণে পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা বাড়ছে বলে স্বাস্থ্যকর্মীরা সতর্ক করেছেন।

থাইল্যান্ড দক্ষিণাঞ্চলে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সেখানে নদী-খালের বিস্তৃত জালের কারণে পানি ছড়িয়ে পড়ার গতি আরও বেশি। বহু গ্রাম ভেসে গেছে, রাবার উৎপাদন অঞ্চলগুলো ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই শিল্প থাইল্যান্ডের অর্থনীতির বড় অংশজুড়ে তাই ক্ষতির প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়বে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। স্কুলগুলো বন্ধ, সড়ক ভেঙে পড়েছে এবং যেসব এলাকায় উদ্ধারপথ নেই- সেখানে হেলিকপ্টার দিয়ে খাদ্য ও ওষুধ পাঠানো হচ্ছে।


এখন প্রশ্ন আসে এত দেশ একসঙ্গে কেন বিপর্যয়ে পড়ছে? আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা বেশ পরিষ্কার। সমুদ্রপৃষ্ঠ এখন ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ অবস্থায় আছে। উষ্ণ সমুদ্র বেশি বাষ্প তৈরি করে আর সেই অতিরিক্ত আর্দ্রতা বৃষ্টি হয়ে নামে। লা নিনার বছরগুলোতে এই বৃষ্টি আরও তীব্র হয় এবং স্থায়ী হয় অনেক বেশি সময়। একের পর এক ভারী বর্ষণ হলে মাটি দ্রুত সম্পৃক্ত হয়ে যায়, তখন সামান্য চাপেই পাহাড় ধসে পড়ে। শহরাঞ্চলে আবার ড্রেনেজ দুর্বল থাকায় পানি নামতে সময় লাগে, ফলে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

গত শুক্রবার সংঘটিত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায় চলাচলের একটি রাস্তা এভাবে দেবে যায়

বিজ্ঞানীরা এ ঘটনাগুলোকে আলাদা করে দেখছেন না। বেন ক্লার্ক বলছেন, সমুদ্র যত উষ্ণ হয়, ঝড়-বৃষ্টি তত শক্তিশালী হয়, আর অস্বাভাবিক ঘটনা বাড়ে। জিয়ানমার্কো মেনগালদো মনে করিয়ে দিচ্ছেন, প্রতিটি দুর্যোগকে জলবায়ু পরিবর্তনের একক ফল বলা না গেলেও বড় চিত্রটা পরিষ্কার। ঝুঁকি বাড়ছে, তীব্রতা বাড়ছে, আর ফিরে আসার সময় কমছে। ধ্রুবজ্যোতি সামন্ত সতর্ক করেছেন যে ধারাবাহিক ঝড় বা বৃষ্টি যে ক্ষয়ক্ষতি ঘটায় তা একবারে বোঝা যায় না; এর প্রভাব জমে পরবর্তী দুর্যোগকে আরও ভয়ংকর করে তোলে।

এশিয়ার বহু দেশেই নগরায়ণ দ্রুত হয়েছে, কিন্তু সেই গতির সঙ্গে অবকাঠামো বা পরিবেশ রক্ষা এগোয়নি। পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি, রাস্তা, রিসোর্ট বানানো হয়েছে; শহরে ড্রেনিং ব্যবস্থায় নজর কম; নদীর জায়গা দখল হয়েছে। এসব কারণে প্রকৃতির কোনো অস্বাভাবিক ওঠাপড়া বড় বিপর্যয়ে পরিণত হয়। মানবিক ক্ষতি তো আছেই; বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অনেকে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে আছে। স্কুল ও হাসপাতাল বন্ধ থাকায় সামাজিক পুনরুদ্ধারও ধীর হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতিও দীর্ঘমেয়াদি হবে- কৃষিজমি নষ্ট হলে খাদ্য উৎপাদনে চাপ বাড়বে আর পর্যটন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্মসংস্থানে ধাক্কা লাগবে।

শ্রীলঙ্কার বন্যার প্রভাব পড়েছে মলয়েশিয়াতেও

এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ খুব সরল। তৎক্ষণাৎ ত্রাণসাহায্য নিশ্চিত করতে হবে। যেমন- বিশুদ্ধ পানি, খাবার, চিকিৎসা, আশ্রয়। এর সঙ্গে আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ-ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন এলাকাগুলো ভূমিধসপ্রবণ, কোন নদী কখন উপচে পড়তে পারে, কোন গ্রামগুলো দ্রুত সরিয়ে নেওয়া দরকার- এসব আগেই চিহ্নিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে দরকার টেকসই অবকাঠামো, জলপ্রবাহের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, নদী ও পাহাড় রক্ষায় কঠোর নীতি আর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ।

বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, এশিয়ার এই ধারাবাহিক বন্যা ও ভূমিধস আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে প্রকৃতি আর আগের মতো অনিশ্চিত নয়; এখন সে বেশি অস্থির, বেশি তীব্র। এই বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া ক্ষণিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে।

সময়ের আলো/এসকে/ 



  বিষয়:   এশিয়া  বন্যা  ভূমিকম্প  বাংলাদেশ  মালয়েশিয়া  শ্রীলঙ্কা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: