বিশ্ব এখন একই সঙ্গে দুই দৌড়ে ছুটছে। একদিকে জলবায়ু সংকট ঠেকাতে টেকসই জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ, অন্যদিকে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতায় আধিপত্য ধরে রাখার লড়াই। কিন্তু সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য—টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ ও ধাতু এখন বিপুল হারে সামরিক কাজে সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। জলবায়ু রক্ষার লড়াই তাই থমকে যাচ্ছে নতুন যুদ্ধযন্ত্র তৈরির চাহিদায়।
এই দ্বন্দ্ব শুধু সম্পদ-সংকট নয়, বরং একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা প্রশ্ন—পৃথিবী কি অস্ত্র বানাবে, নাকি ভবিষ্যৎ বাঁচাবে? খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ উদ্যোগ ট্রানজিশন সিকিউরিটি প্রজেক্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা জলবায়ু মোকাবিলার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় ব্যবহারযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলো দ্রুত সামরিক কাজে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব খনিজ দিয়ে তৈরি হয় সৌর প্যানেল, ইভি ব্যাটারি, উইন্ড টারবাইন এবং বড় আকারের শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন সেগুলো মজুদ করছে সামরিক সরঞ্জামের জন্য।
ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর বড় একটি বিল পাস করেন। তার পর থেকেই পেন্টাগন জাতীয় প্রতিরক্ষা ভাণ্ডারে বিপুল খনিজ সংরক্ষণ শুরু করেছে। লক্ষ্য—পরবর্তী প্রজন্মের নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং এআইচালিত যুদ্ধ প্রযুক্তি।
ট্রানজিশন সিকিউরিটি প্রজেক্ট জানায়, পেন্টাগনের এই পরিকল্পনা জলবায়ু লড়াইকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। প্রকল্পের সহ-পরিচালক কেম রাগালি বলেন, মার্কিন সামরিক বাজেট আসলে বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখার অবকাঠামো তৈরি করছে। এতে জাতীয় নিরাপত্তা নয়, বরং সামরিক শিল্পই লাভবান হচ্ছে।
প্রতিবেদন বলছে, কমপক্ষে ৩৮ ধরনের খনিজ যেমন লিথিয়াম, কোবাল্ট, গ্রাফাইট ও রেয়ার আর্থ পেন্টাগন এখন মজুদ করছে। এই খনিজগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু সামরিক চাহিদা বাড়ায় সেগুলো অন্য কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বিশেষ উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে কোবাল্ট নিয়ে। পেন্টাগন প্রায় ৭ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন কোবাল্ট মজুদ করতে চায়। এই পরিমাণ কোবাল্ট দিয়ে ৮০ গিগাওয়াট-ঘণ্টা ব্যাটারি তৈরি সম্ভব। যা যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান শক্তি সঞ্চয় ক্ষমতার দ্বিগুণ। একই পরিমাণ কোবাল্ট দিয়ে তৈরি করা যেত প্রায় ১ লাখ বৈদ্যুতিক বাস।
প্রতিবেদনের লেখক লোরাহ স্টেইশেন বলেন, প্রতি টন কোবাল্ট বা গ্রাফাইট সামরিক ভাণ্ডারে গেলে নবায়নযোগ্য শক্তির ভবিষ্যৎ দুর্বল হয়। জলবায়ু সংকট কমাতে প্রয়োজন এসব খনিজের বেসামরিক ব্যবহার। কিন্তু সেগুলো এখন যুদ্ধযন্ত্রের জ্বালানি হয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক দূষণকারী। তারা একাই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মোট নির্গমনের প্রায় ৮০ শতাংশ সৃষ্টি করে। অথচ ট্রাম্প আমলে পেন্টাগন জলবায়ু পরিবর্তনকে গুরুত্বহীন হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তো লিখেছেন, ‘ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্স জলবায়ুর সুরক্ষায় কাজ করে না।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পেন্টাগনের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট শুধু অস্ত্র উন্নয়নই নয়, বরং পুরো খনিজ সরবরাহ চেইনকে প্রভাবিত করে। তারা নতুন খনি প্রকল্পে সরাসরি বিনিয়োগ করছে, ঝুঁকি বহন করছে এবং বাজারকে সামরিক স্বার্থে পরিচালিত করছে। ২০২৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের অন্তত ২০টি খনি প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে পেন্টাগন।
এসব উদ্যোগ জলবায়ু সমাধানকে দুর্বল করে। বৈশ্বিক শান্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর সামরিকতন্ত্রের চাহিদায় সরকারে বেসামরিক খাতের ভূমিকা কমে যায়। প্রতিবেদনটি সতর্ক করেছে—এই ভুল অগ্রাধিকার শুধু পৃথিবীর ভবিষ্যৎকেই ঝুঁকিতে ফেলছে না, বরং ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের সম্ভাবনাও থামিয়ে দিচ্ছে।
এফআর