ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অচলাবস্থা ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে যে তৎপরতা চলছে, সেটি প্রকাশ্য আলোচনার বাইরে থেকেও আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ানে সৈন্য ও নৌ-সমরাস্ত্র জড়ো করছে। তার ওপর ব্যাখ্যার মোড়ক দেওয়া হয়েছে মাদকের প্রবাহ ঠেকানোর উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু হোয়াইট হাউসের ভেতরের আলাপ বলছে, লক্ষ্য আরও গভীর। নীরবে তৈরি হচ্ছে মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলার খসড়া নকশা।
হোয়াইট হাউসের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, মাদুরো ক্ষমতা ছাড়লে পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবে যুক্তরাষ্ট্র সে বিষয়ে একাধিক বিকল্প পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই আলোচনার টেবিলে আছে। মাদুরো আলোচনার মাধ্যমে সরে দাঁড়ান বা মার্কিন হামলার পর বাধ্য হন দুই ক্ষেত্রের জন্যই আলাদা রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি এতটাই সংবেদনশীল যে, পরিকল্পনা প্রণয়ন চলছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কাউন্সিলের সীমিত একটি পরিসরে, যার নেতৃত্বে আছেন স্টিফেন মিলার। তিনি আবার ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে মার্কো রুবিওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন।
সমস্যা হচ্ছে, প্রশাসনের ভেতরেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে মতভেদ আছে। ট্রাম্প একদিকে প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন ‘তার সময় শেষ’। অন্যদিকে কর্মকর্তাদের বড় অংশ সরাসরি সামরিক জড়িত হওয়ার পক্ষে নন। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প মাদুরোর সঙ্গে সাম্প্রতিক ফোনালাপে তাকে দেশ ছাড়ার সরাসরি ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে নৌকা ‘উড়িয়ে দেওয়া’ অভিযান চলতেই থাকবে। এমনকি মাদক ও অভিবাসনপ্রবাহ দমন করতে সিআইএকে ভেনেজুয়েলার ভেতরে কাজের অনুমতি দিয়েছেন বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।
ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতৃত্ব মারিয়া কোরিনা মাচাদো এবং এডমুন্ডো গনজালেস নিজেরা বহুদিন ধরে ‘১০০ ঘণ্টা’ ও ‘১০০ দিন’ সময়সীমায় মাদুরো-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার নকশা তৈরি করে রেখেছে। সেই পরিকল্পনার কিছু অংশ তারা মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গেও ভাগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র গনজালেসকে গত নির্বাচনে প্রকৃত বিজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে মাচাদো ও গনজালেস কি তাৎক্ষণিকভাবে নেতৃত্ব নিতে পারবেন? তবে এসবই এখনও প্রাথমিক ভাবনা; কিছুই আনুষ্ঠানিক নয়।
মূল প্রশ্ন এখন অন্য জায়গায়। মাদুরোর বিদায়ের পথ কোনটি হবে এবং তার পর ভেনেজুয়েলাকে স্থিতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্র কী পরিমাণ সহায়তা দেবে? দেশটি দীর্ঘদিন ধরে সংকটে জর্জরিত। কোনো তড়িঘড়ি পরিবর্তন সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মত, সেখানে সেনা পাঠানো কঠিন হলেও নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও অর্থনৈতিক সহায়তা অপরিহার্য হবে। অতীতের ভুল ট্রাম্প পুনরাবৃত্তি করতে চাইবেন না; ২০০৩ সালের ইরাক হয়ে উঠেছে এখন সতর্কতার প্রতীক।
মাদুরোর সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনাও সংকীর্ণ। মার্কো রুবিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, গত দশ বছরে পাঁচটি চুক্তি করেও মাদুরো প্রতিবারই প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করছেন না, কিন্তু সময় দিচ্ছেন অনেক কম। আরেকটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন ঝুলে আছে নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক বৈধতা নিয়ে। মাচাদো ও গনজালেস নেতৃত্ব নিলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি সহজ। কিন্তু যদি অন্তর্বর্তী সরকারে চাভিস্তার মতো লোকেরাও থাকে তখন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আর্থিক সহায়তার পথ জটিল হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলা ইস্যুটি প্রকাশ্যে যতটা স্থবির মনে হচ্ছে, পর্দার আড়ালে চলছে তার বিপরীত দৃশ্য। গোপনে এগোচ্ছে মাদুরো-পরবর্তী বাস্তবতার খসড়া। ট্রাম্প প্রকাশ্যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেও প্রকৃত লড়াই এখন হোয়াইট হাউসের ভেতরেই। কখন, কীভাবে এবং কোন পথ ধরে মাদুরোকে সরানো হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নীরব প্রস্তুতিই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে পরিস্থিতি যতই অনিশ্চিত হোক, মার্কিন প্রশাসন মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলার রূপরেখা নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা একে একে ঠিক করে নিচ্ছে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা।
সময়ের আলো/এসকে/