বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করেছিল তার সরকারের অর্থনীতি উদারীকরণ কর্মসূচি। যার ফলে প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ ও ব্যবসা বাণিজ্য বাড়তে শুরু করেছিল। খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলেও দুবার তিনি তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিলেন। ওই দুই মেয়াদের বিভিন্ন পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, লুক ইস্ট পলিসির মাধ্যমে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ভারতের সাথে সাম্যতা রেখে সবার সাথে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের সাথে বিএনপি সরকারের 'সুসম্পর্ক' কতটা ছিল তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিতর্ক আছে। আবার নানা উদ্যোগ নিয়েও চীনের সাথে কেন সম্পর্কের ভিত শক্ত করা যায়নি তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। খালেদা সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও সে সময়কার পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করলে এটি পরিষ্কার যে 'খোলা বাজার অর্থনীতি'র পথে তার সরকার যে যাত্রা শুরু করেছিল, সেটিই পররাষ্ট্রনীতিতে ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছিল। তিনি নিজেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ সফরে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, ‘খালেদা জিয়া সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক জায়গা তিনটি, লুক ইস্ট পলিসির মাধ্যমে চীন থেকে শুরু করে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বাড়ানো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার এবং সার্ক ও বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। ওই সময়টায় রোহিঙ্গা পুশ ইনও কম হয়েছে। আবার মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানি ব্যাপক বেড়েছে, ওআইসির মতো সংস্থায় বাংলাদেশ সেক্রেটারি জেনারেল পদে নির্বাচন করেছে, যা সংস্থাটির সদস্য দেশগুলোর সাথে তখন সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দিয়েছে।’
বিএনপির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ১৯৯১-৯৫ সালের প্রথম মেয়াদে মিয়ানমার ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৩ জন শরণার্থীকে খালেদা জিয়ার উদ্যোগের কারণেই ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। বিগত ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বেগম জিয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেন এবং দ্রুত তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর পদক্ষেপ নেন।
সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘকালীন সংকট ছিল তিনবিঘা করিডর। সেই তিনবিঘা করিডর পালাক্রমে ৬ ঘণ্টা করে দুই দেশের জন্য উন্মুক্ত হয়েছিল ১৯৯২ সালের জুন মাসে। যদিও এ সংক্রান্ত সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছিল জেনারেল এরশাদের শাসনামলের শুরুর দিকে। কিন্তু বাস্তবায়িত হয় বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সরকার অর্থনীতিতে উদারীকরণ করায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন সুযোগ উন্মোচিত হয়েছিল। এর ফলে, ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ল। যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলো এবং এর জেরে অর্থনীতি নতুন গতি লাভ করল। এমনকি ইলিশ মাছ তখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম ভারতে রফতানি হয়। খালেদা জিয়া সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ২৪টির মতো দেশকে কালো তালিকাভুক্ত করার ঘটনা ঘটেছিলো। তখন সরকার সেই তালিকায় বাংলাদেশের নাম যেন না আসে সেজন্য সফল উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে দুটি মেয়াদেই খালেদা জিয়ার সরকারকে রাজনৈতিক সংকট অভ্যন্তরীণভাবে মোকাবেলা করতে হয়েছে।
সাবেক কূটনীতিকরা আরও বলছেন, বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্য, আরব দেশ ও মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা ছিল। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ও ওআইসির সাথে তখন সম্পর্ক বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে অনেকের কাছে বিস্ময়ের বিষয় হলো- চীনের সাথে শাহজালাল সার কারখানাসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি প্রথম মেয়াদে করেও নিজের মেয়াদেই তা বাতিল করে দিয়েছিল খালেদা জিয়ার সরকার। অনেকের ধারণা, চীনের সাথে বিএনপি কিংবা বিএনপি সরকারের সম্পর্কের অবনতির সূচনাও হয়েছিলো এর মধ্য দিয়ে। আবার নদনদীর পানি বণ্টনসহ ভারতের সাথে থাকা দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর নিষ্পত্তিতে খুব একটা অগ্রগতি আসেনি সেই সময়কালে। অনেক ক্ষেত্রে তার ও বিএনপির 'ভারত-বিরোধিতার' ঐতিহাসিক রাজনীতিও দুই দেশের সম্পর্কের গতি প্রকৃতিতে তখন ভূমিকা রেখেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে, লুক ইস্ট পলিসির মাধ্যমে চীনসহ দক্ষিণ পূর্ব দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ ব্যাপক বেড়েছে। এর আগে এরশাদ সরকারের সময় বাংলাদেশের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক বেড়েছিল এবং তখন বড় বড় অনেক সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে চীনা বিনিয়োগ আসা শুরু হয়। কিন্তু বিএনপি আমলেই আবার তাইওয়ান ইস্যুতে, বিশেষ করে ঢাকায় তাইওয়ানের অফিস খোলা নিয়ে চীনের সাথে বিএনপি সরকারের দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্য, মুসলিম দেশ ও ওআইসির সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রথম মেয়াদেই পাকিস্তানের সাথেও সম্পর্ক শক্তিশালী করতে পেরেছিল খালেদা জিয়ার সরকার। আবার দ্বিতীয় মেয়াদে চীন ছাড়াও কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর নীতিগত আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছিল।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের প্রথম মেয়াদের প্রায় অর্ধেক সময় জুড়ে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তুমুল আন্দোলন করেছিল।
সময়ের আলো/এনএ