সারাদেশের মসজিদগুলোর জনবল কাঠামোকে আরও সুসংগঠিত করা এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্যের অবসান ঘটাতে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে প্রকাশিত সরকারি গেজেটে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দীক।
দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় খতিব ফাউন্ডেশন খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিতে একটি নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই সরকার এ বেতন কাঠামো নির্ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় খতিব পরিষদের সভাপতি মুফতি মাওলানা শামীম মজুমদার। তিনি যুগান্তরকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বহুদিনের দাবি পূরণ করায় আলেম সমাজের পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারকে অভিনন্দন জানানো হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের সব মসজিদে খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বেতনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর হবে।
জাতীয় বেতন স্কেলে মসজিদের পদমর্যাদা
নতুন নীতিমালায় মসজিদের বিভিন্ন পদকে সম্মানজনকভাবে জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় গ্রেডভুক্ত করা হয়েছে। গেজেট অনুযায়ী নির্ধারিত গ্রেডগুলো হলো—
সিনিয়র পেশ ইমাম : ৫ম গ্রেড
পেশ ইমাম : ৬ষ্ঠ গ্রেড
ইমাম : ৯ম গ্রেড
মুয়াজ্জিন : প্রধান মুয়াজ্জিন ১০ম গ্রেড এবং সাধারণ মুয়াজ্জিন ১১তম গ্রেড
খাদেম : প্রধান খাদেম ১৫তম গ্রেড এবং সাধারণ খাদেম ১৬তম গ্রেড
অন্যান্য কর্মী : নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ২০তম গ্রেড
তবে খতিবদের ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাদের সম্মানী বা বেতন সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
আচরণবিধি ও নৈতিক নির্দেশনা
বেতন কাঠামোর পাশাপাশি মসজিদের জনবলদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট আচরণবিধিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গেজেটে বলা হয়েছে—
১. রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা: মসজিদের কোনো কর্মী কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।
২. ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব পালন: ইমাম ও খতিবদের মুসল্লি ও স্থানীয় জনগণের নৈতিক ও ধর্মীয় উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
৩. দায়িত্বে শৃঙ্খলা বজায় রাখা: অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা বা দায়িত্বস্থল ত্যাগ করাকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হবে।
বেতন প্রদানের দায়িত্ব কার?
এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গেজেট অনুযায়ী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হলো—
সরকারি ও মডেল মসজিদ : সরকার পরিচালিত মসজিদ যেমন বায়তুল মোকাররম, আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ এবং নবনির্মিত ৫৬০টি মডেল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা সরাসরি সরকারি তহবিল বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এ স্কেলে বেতন পাবেন।
বেসরকারি বা স্থানীয় মসজিদ : পাড়া-মহল্লা বা গ্রামভিত্তিক কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত মসজিদগুলোর ক্ষেত্রে এই গেজেট একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে এসব মসজিদে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বেতন প্রদানের মূল দায়িত্ব স্থানীয় কমিটির ওপরই থাকবে। সরকার তাদের এ কাঠামো অনুসরণে উৎসাহ প্রদান করবে।
এই নীতিমালা প্রণয়নে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি কাজ করেছে। চূড়ান্ত করার আগে দেশের খ্যাতনামা আলেম-ওলামা ও ইমাম-খতিব সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।
নীতিমালায় খতিব ব্যতীত মসজিদে কর্মরত অন্যান্য জনবলের জন্য গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। খতিবদের বেতন চুক্তিপত্র অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। আর্থিকভাবে দুর্বল এবং পাঞ্জেগানা মসজিদের ক্ষেত্রে সামর্থ্য অনুযায়ী বেতন-ভাতা নির্ধারণের নির্দেশনাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ নীতিমালায় মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে কর্মরত জনবলের প্রয়োজন অনুযায়ী সপরিবারে আবাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য মাসিক সঞ্চয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং চাকরি শেষে এককালীন সম্মাননা প্রদানের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
মসজিদে কর্মরতদের ছুটির বিষয়টিও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিটির অনুমোদনক্রমে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ চারদিন সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করা যাবে। এছাড়া, বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি এবং প্রতি ১২ কর্মদিবসে একদিন করে অর্জিত ছুটির সুযোগ থাকবে।
এই নীতিমালা অনুযায়ী, মসজিদের কোনো পদে নিয়োগের জন্য সাত সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির সুপারিশ ছাড়া সরাসরি নিয়োগ দেওয়া যাবে না। নিয়োগপত্রে বেতন-ভাতা, দায়িত্ব ও চাকরি সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার বিধান রাখা হয়েছে।
২০২৫ সালের এ নীতিমালায় মসজিদে নিরাপত্তা প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পাশাপাশি নারীদের জন্য শরিয়তসম্মতভাবে পৃথক নামাজের কক্ষ বা স্থান রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ জন করা হয়েছে, তবে মসজিদের আয়, আয়তন ও অবস্থান বিবেচনায় এ সংখ্যা কমানো বা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
চাকরি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসার অথবা সিটি কর্পোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। এছাড়া, নীতিমালা বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা দেখা দিলে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি তা সমাধান করবে। এই নীতিমালা কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে ২০০৬ সালের মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা বাতিল করা হয়েছে।
/ইউএমএইচ