হুদায়বিয়ার সন্ধি ও নবীজি (সা.)-এর পররাষ্ট্রনীতি

মাওলানা দৌলত আলী খান

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম ভিত্তি হলো পররাষ্ট্রনীতি। এর মাধ্যমে নিজের রাষ্ট্র বহির্দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে থাকে। আর পররাষ্ট্রনীতির একটি

2026-02-08T05:33:49+00:00
2026-02-08T05:35:12+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
হুদায়বিয়ার সন্ধি ও নবীজি (সা.)-এর পররাষ্ট্রনীতি
মাওলানা দৌলত আলী খান
প্রকাশ: রোববার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:৩৩ এএম  আপডেট: ০৮.০২.২০২৬ ৫:৩৫ এএম
হুদায়বিয়ার সন্ধির স্থান। সংগৃহীত ছবি
রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম ভিত্তি হলো পররাষ্ট্রনীতি। এর মাধ্যমে নিজের রাষ্ট্র বহির্দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে থাকে। আর পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো সন্ধি-চুক্তি। এ সন্ধির পুরোধা হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)। 

তিনি ছিলেন একজন পররাষ্ট্রনীতিবিদ। নবীজি (সা.) মদিনা রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ঐতিহাসিক মদিন সনদ প্রণয়ন করেন। আর মক্কা ও মদিনা উভয় রাষ্ট্রের মাঝে কলহ-দ্বন্দ্ব বন্ধে ও যাতায়াত নিরাপদ করার লক্ষ্যে হুদায়বিয়ার সন্ধি স্থাপন করেন তিনি। হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল রাসুল (সা.)-এর প্রথম বৈদেশিক চুক্তি। 

একজন দক্ষ পররাষ্ট্রনীতিবিদ হিসেবে এ ক্ষেত্রে তিনি যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতেই মক্কা বিজয়ের সূচনা রচিত হয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধের নির্দেশ নাজিল হওয়ার পর তওহিদের বাণী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুসলমানরা কাফেরদের সঙ্গে অসংখ্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এসব যুদ্ধে রাসুল (সা.) সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতার সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন। 

বদর, উহুদ, খন্দক যুদ্ধের পর হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে মদিনা প্রথমবারের মতো কুরাইশদের কাছে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আপাতদৃষ্টিতে তাৎক্ষণিকভাবে এই সন্ধি-চুক্তি মুসলমানদের জন্য অপমানজনক মনে হয়েছিল। কিন্তু দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই চুক্তিকে মুসলমানদের অনুকূল বুঝতে পেরে বিনা বাক্যব্যয়ে এতে সম্মতি হন। হিজরি ষষ্ঠ সনে এ সন্ধি সম্পাদন করা হয়। এর আগে মদিনায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও তা কোনো দিনই কুরাইশদের কাছে স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে তারা মুসলমানদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রশক্তি হিসেবে লিখিতভাবে মেনে নেয় এবং রাসুল (সা.)-কে মদিনা প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌম নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তগুলো : হাদিস শরিফে হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পর্কে বিশদ আলোচনা রয়েছে। আজ অবধি পৃথিবীর ইতিহাসে নবীজি (সা.)-এর এ চুক্তিনীতি লিপিবদ্ধ রয়েছে। হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ করা হয় যা প্রত্যক্ষভাবে মুসলমানদের প্রতিকূলে গেলও তা পরবর্তীতে মুসলমানদের অনুকূলে কল্যাণময় ভূমিকা রাখে।

হাদিসে আছে, হজরত বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) হুদায়বিয়ার দিন মুশরিকদের সঙ্গে তিনটি শর্তের ওপর চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন ১. মক্কার কোনো মুশরিক ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর কাছে মদিনায় এলে তাকে কুরাইশদের কাছে ফেরত দিতে হবে। 

আর মদিনা থেকে কোনো মুসলমান মুরতাদ হয়ে তাদের কাছে মক্কায় গেলে তাকে মুসলমানদের কাছে ফেরত দিতে হবে না। ২. আগামী বছর মুসলমানরা মাত্র তিন দিনের জন্য মক্কায় আসতে পারবেন। ৩. মক্কায় প্রবেশকালে সমরাস্ত্র, তলোয়ার ও তীর-ধনুক ইত্যাদি কোষবদ্ধ রাখতে হবে (বুখারি : ২৭৪০)। অন্য হাদিসে আরেকটি শর্তের কথা উল্লেখ রয়েছে যে, উভয়পক্ষের মধ্যে ১০ বছর যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। (আবু দাউদ : ২৭৬৮)

হুদায়বিয়ার সন্ধিতে নবীজি (সা.)-এর অন্তর্দৃষ্টি : হুদায়বিয়ার সন্ধির মধ্যে একটি শর্ত হলো, ‘মক্কার কোনো মুশরিক ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় গেলে তাকে কুরাইশদের কাছে ফেরত দিতে হবে। আর মদিনা থেকে কোনো মুসলমান মুরতাদ হয়ে মক্কায় গেলে তাকে মুসলমানদের কাছে ফেরত দিতে হবে না।’ 

এ শর্তের ওপর সাহাবিরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেন এবং তা মানতে অসম্মতি জানালেন। কিন্তু উপর্যুক্ত শর্ত মুসলমানদের বিপক্ষে গেলও তাতে নবীজি (সা.) ইসলামের কল্যাণ অনুধাবন করলেন। এমনকি এতে মুমিনদের মুক্তির পথ খুঁজে পেলেন তিনি। কারণ রাসুল (সা.) ছিলেন অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী। আর তাঁর কাছে তাগুতি শক্তি সবসময় অসহায়।

হাদিসে আছে, হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, কুরাইশরা নবী করিম (সা.)-এর সঙ্গে সন্ধি করল। তাতে তারা নবীজি (সা.)-এর ওপর এই শর্ত আরোপ করল যে, যদি মুসলমানদের কোনো লোক মক্কায় আসে, তবে তাকে আমরা ফেরত দেব না। আর কুরাইশদের কোনো লোক মদিনায় গেলে তবে তোমরা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। 

এ শর্ত শুনে সাহাবিরা ক্ষোভের সঙ্গে বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি এ শর্তও লিখে নেবেন? হুজুর (সা.) দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। কেননা আমাদের কাছ থেকে যে ব্যক্তি তাদের কাছে গিয়েছে তাকে আল্লাহ স্বীয় রহমত থেকে বঞ্চিত করেছেন (কারণ মুরতাদ ব্যক্তি এরূপ যেতে পারে)। আর তাদের যেই লোক আমাদের কাছে আসবে তাকে ফেরত দিলেও আশা করা যায়, আল্লাহ তায়ালা অচিরেই তার মুক্তির একটি পথ উন্মুক্ত করে দেবেন। কারণ সে হবে মুসলমান। (মুসলিম : ৪৭৩২)

চুক্তি ভঙ্গ বড় অন্যায় : বৈদেশিক চুক্তি, রাষ্ট্রীয় চুক্তি, দলীয় চুক্তি ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কার্যকর হয়ে থাকে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে যে সময় নির্ধারিত হয় তা পর্যন্ত চুক্তি বলবৎ থাকবে। যেমন হুদায়বিয়ার সন্ধি দশ বছরের জন্য সম্পাদন করা হয়েছিল। তাই নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার আগে চুক্তি লঙ্ঘন করা উভয়পক্ষের জন্য অন্যায়। রাসুল (সা.) চুক্তি লঙ্ঘনকে জুলুম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। 

কেয়ামত দিবসে চুক্তি লঙ্ঘন করার অপরাধে শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি এমন কোনো লোকের ওপর জুলুম করে, যার সঙ্গে তার সন্ধি হয়েছে অথবা তার কোনো প্রকার ক্ষতি সাধন করে অথবা সাধ্যের অতিরিক্ত তাকে কষ্ট দেয় কিংবা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক তার কাছ থেকে কোনো জিনিস আদায় করে, কেয়ামতের দিন আমিই ওই মজলুমের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করব। (আবু দাউদ : ৩০৫৪)

হুদায়বিয়ার সন্ধিতে মুসলমানদের বিজয় : হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তাবলি আপাতদৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য অপমানজনক ছিল। কিন্তু গভীরভাবে এ শর্তগুলো পরবর্তীতে ইসলামের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ চুক্তির পর দ্রুত ইসলামের বিকাশ ঘটিয়ে মুসলমানরা মক্কা বিজয় করেন।

এ ছাড়া আরও ফলাফল হলো সন্ধির পরের বছর কাজা ওমরাহ করার সময় ২ হাজার এবং তার দুই বছর পর মক্কা বিজয়ের সময় ১০ হাজার মুসলমান নবীজির সাথি হন। হুদায়বিয়ার সন্ধির আলোকে এটাই হলো মুসলিম উম্মাহর অনন্য বিজয়। কুরআন শরিফেও আল্লাহ তায়ালা হুদায়বিয়ার সন্ধিকে সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (সিরাতে মুস্তফা : ১/২৯০)

শিক্ষক, নাজিরহাট বড় মাদরাসা
     ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম

সময়ের আলো/এআর

  বিষয়:   হুদায়বিয়া  সন্ধি  নবীজি (সা.)  পররাষ্ট্রনীতি 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: