ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন ও ভোটদান

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ব্যক্তি ইবাদত ও নৈতিকতার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব, রাষ্ট্র পরিচালনা ও নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা

2026-02-10T04:27:35+00:00
2026-02-10T04:27:35+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন ও ভোটদান
ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:২৭ এএম 
ফাইল ছবি
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ব্যক্তি ইবাদত ও নৈতিকতার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব, রাষ্ট্র পরিচালনা ও নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচন ও ভোটদান হলো নেতৃত্ব বাছাই এবং জনমতের প্রতিফলনের প্রধান মাধ্যম। এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন হলো, ইসলামে ভোট দেওয়ার অবস্থান কী? এটি কি কেবল নাগরিক অধিকার, নাকি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও বটে? কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে এ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ভোট হলো আমানত : ভোট মূলত একটি আমানত। একজন ভোটার তার ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা ও দায়িত্ব কাউকে অর্পণ করে। এটি যত্নসহকারে ব্যবহার করতে হবে, কারণ এ আমানতের মাধ্যমে সমাজে অন্যায় ও জুলুমের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দিতে (সুরা আন-নিসা : ৫৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো। জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে আমানত নষ্ট হবে? তিনি বললেন, ‘যখন অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ করা হবে’ (বুখারি : ৫৯)। অতএব জেনেবুঝে অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত বা জালিম প্রার্থীকে ভোট দেওয়া স্পষ্টতই আমানতের খেয়ানত। ভোটের মাধ্যমে একজন নাগরিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও জনকল্যাণের দায়িত্ব প্রেরণ করছে। এটি যথাযথভাবে ব্যবহার করলে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয়, অন্যথায় এটি দায়িত্বহীনতার সূচক।

ভোট হলো সাক্ষ্য : ভোট দেওয়া এক অর্থে সাক্ষ্য প্রদান। একজন ভোটার কার্যত ঘোষণা দেন, এই ব্যক্তি নেতৃত্বের জন্য যোগ্য। এটি ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, বরং জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে তা গোপন করে, তার হৃদয় অবশ্যই গুনাহগার’ (সুরা আল-বাকারা : ২৮৩)। আল কুরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাক্ষ্যদাতা হও’ (সুরা মায়েদা : ৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সবচেয়ে বড় গুনাহগুলোর একটি হলো মিথ্যা সাক্ষ্য (সহিহ বুখারি: ২৬৫৪)। অতএব অযোগ্য ব্যক্তিকে সমর্থন করা মিথ্যা সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা একটি গুরুতর ধর্মীয় অপরাধ।

নেতৃত্বে যোগ্যতা ও সততা : ইসলাম নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও সততাকে মূল শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। জনপ্রিয়তা, পারিবারিক সম্পর্ক বা রাজনৈতিক অন্ধত্ব কোনো ভিত্তি হতে পারে না। কুরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই সর্বোত্তম কর্মচারী সে, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত (সুরা আল-কাসাস : ২৬)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে আবু জর! তুমি দুর্বল, আর নেতৃত্ব একটি আমানত। কেয়ামতের দিন তা লজ্জা ও অনুশোচনার কারণ হবে, যদি না কেউ তা যথাযথভাবে আদায় করে’ (মুসলিম : ১৮২৫)। সুতরাং ভোটের সময় একজন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব হলো যোগ্যতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা যাচাই করা এবং সেসব প্রার্থীকে ভোট দেওয়া যারা জনকল্যাণের জন্য কাজ করতে পারে।

জালিম ও অন্যায়কারীদের সমর্থন হারাম : ইসলাম জুলুম ও অন্যায়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। যে ব্যক্তি জেনেবুঝে জালিম বা দুর্নীতিবাজকে সমর্থন করে, সে সমাজে অন্যায়ের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং ইসলামি নৈতিকতা লঙ্ঘন করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা জালিমদের দিকে ঝুঁকো না, তা হলে আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে (সুরা হুদ : ১১৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো জালিমকে সাহায্য করল, অথচ সে জানে সে জালিম, সে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন (বাইহাকি : ১৮৬৩৪)। অতএব ভোটের মাধ্যমে জালিমকে ক্ষমতায় আনা স্পষ্টতই অন্যায়ে সহযোগিতা।

শূরা ও জনমতের গুরুত্ব : ইসলাম একনায়কতন্ত্র সমর্থন করে না, বরং শূরা বা পরামর্শভিত্তিক শাসনকে উৎসাহিত করে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাধানে শূরা ও জনমতের গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়’ (সুরা শূরা : ৩৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.) রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন (সহিহ বুখারি : ৪৪২৫)। আধুনিক নির্বাচনি ব্যবস্থায় ভোট হলো শূরার একটি শান্তিপূর্ণ ও কার্যকর বাস্তব রূপ।

ভোটের মাধ্যমে অন্যায় প্রতিরোধ : ভোট অন্যায় প্রতিরোধের একটি বৈধ মাধ্যম। ইচ্ছাকৃতভাবে ভোট না দেওয়া বা ভুল ব্যক্তিকে সমর্থন করা সমাজে অন্যায়কে প্রসারিত করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যদি অন্যায় দেখো, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে; তা না পারলে মুখ দিয়ে; তা-ও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করো, এটাই ঈমানের দুর্বলতম স্তর (সহিহ মুসলিম : ৪৯)। যেখানে ভোটের মাধ্যমে অন্যায় প্রতিরোধ সম্ভব, সেখানে সক্রিয় ভোটদান ইসলামিক নৈতিক দায়িত্বের অংশ।

ভোট কেনাবেচা ও ঘুষ হারাম : ভোট কেনাবেচা, ঘুষ গ্রহণ বা প্রভাব বিস্তার ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটি ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি বড় অন্তরায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপরই আল্লাহর লানত (আবু দাউদ : ৩৫৮০)। অতএব সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক ভোটদান নিশ্চিত করা ইসলামের নৈতিক দাবির মধ্যে পড়ে। মোটকথা, ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট শুধু নাগরিক অধিকার নয়; এটি আমানত, সাক্ষ্য ও শূরা এই তিনটির সমন্বিত রূপ। সৎ উদ্দেশ্যে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য ভোটদান ইবাদতের মর্যাদা পেতে পারে। পক্ষপাত, লোভ বা ভয়ের কারণে ভুল ভোট দেওয়া মারাত্মক গুনাহের কারণ হতে পারে। তাই একজন মুসলমান ভোটারের দায়িত্ব হলো ভোটকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করা, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা, জালিম ও দুর্নীতিবাজকে বর্জন করা, ঘুষ ও অন্যায় প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা। এইভাবে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতসদৃশ দায়িত্বে পরিণত হয়, যা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক। সুতরাং ইসলামিক নীতি অনুসারে ভোটদান শুধু অধিকার নয়, বরং একটি নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য।


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: