নির্বাচন পরবর্তী দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। থানাগুলোকে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে মামলা নিতে দেওয়া হয়েছে কঠোর বার্তা। একইসঙ্গে কোনো চাপের কাছে মাথানত না করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হামলা-সংঘাতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও। একইসঙ্গে এসব নির্যাতন বন্ধ করা না হলে কঠোর অবস্থান নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। অন্যদিকে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও যেকোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং কোনো অজুহাতে দুর্বলের ওপর অবিচার মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট। বড় ধরনের কোনো সংঘাত-রক্তপাত ছাড়াই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় একটি জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচনের পর দিন থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বিজয়ী প্রার্থীর পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের দ্বারা পরাজিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে দুজনের মৃত্যুসহ শতাধিক আহত হয়েছে।
নির্বাচনের পর দিন থেকে নাটোর, বাগেরহাট, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ, ঝালকাঠি, ঝিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, মেহেরপুর, পটুয়াখালী, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সংঘাত, প্রতিপক্ষের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং মারধরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় বাগেরহাট ও মুন্সীগঞ্জে দুজনের মৃত্যু হয়।
নির্বাচনের পর দিন গত শুক্রবার মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সদর উপজেলায় দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে নির্বাচনি সহিংসতায় জসিম উদ্দিন নামের এক তরুণ নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও ১০ জন। গত শুক্রবার বিকালে উপজেলার চরআব্দুল্লাহ গ্রামে এই সহিংসতা ঘটে। নিহত তরুণের পরিবার বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা কমিটির বহিষ্কৃত সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিনের সমর্থক। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ সদর থানার ওসি মমিনুল ইসলাম শনিবার রাতে সময়ের আলোকে বলেন, পূর্ব বিরোধ এবং নির্বাচনি দ্বন্দ্বের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর গতকাল এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থক ওসমান সরদার (২৯) নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বিএনপি ও দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হওয়ার পর গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তিনি সদর উপজেলার পাড়নওয়াপাড়া গ্রামের শাহজাহান সরদারের ছেলে এবং বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ এইচ সেলিমের সমর্থক ছিলেন। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাগেরহাটের কচুয়া থানার ওসি মো. শফিক।
নাটোরের বড়াইগ্রামে জামায়াত কর্মীকে মারধরের জেরে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে শনিবার সংঘর্ষ ঘটেছে। এ সময় বেশ কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৬ জন আহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার ধানাইদহ পূর্বপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
বড়াইগ্রাম থানার ওসি আব্দুস সালাম বলেন, সময়ের আলোকে আরও বলেন, সংঘর্ষ ও বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে থানায় এজাহার দেওয়া হয়েছে এবং এই ঘটনায় বিএনপি সমর্থক ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নিরপেক্ষভাবে কোনো চাপের কাছে মাথানত না করে আইন অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। যে-ই আইন ভঙ্গ করবে তার বিরুদ্ধেই আমরা নির্দ্বিধায় ব্যবস্থা নেব। আমাদের শীর্ষ কর্মকর্তারাও সেই রকমই নির্দেশ দিয়েছেন। আইনপ্রয়োগে কোনো পক্ষ থেকেই কোনো ধরনের চাপ পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি।
শনিবার সকালে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় ফরিদপুরের সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। এ সময় বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় ৪ জনকে আটক করার তথ্য জানিয়েছেন সালথা থানার এসআই মো. শাজাহান। তিনি বলেন, এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচন উত্তর সংঘাত, হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করে অবিলম্বে তা বন্ধের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
সারজিস আলম : পঞ্চগড়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের ওপর বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। বিএনপি নেতাকর্মীরা এমন কর্মকাণ্ড করতে থাকলে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও শনিবার তার সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
অভিযোগ করে সারজিস আলম বলেন, ৩০টির মতো জায়গায় আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। তাদের রক্তাক্ত করা হয়েছে, বাড়িঘর-দোকানপাটে হামলা করা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী : জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর ভিন্নমতাবলম্বী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা এখনও জীবিত এবং জনগণের ম্যান্ডেট কোনোভাবেই নির্যাতনের লাইসেন্স নয়। শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন।
তারেক রহমান : বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, কোনো অজুহাতে কারও প্রতি অন্যায় করা যাবে না। যেকোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো অজুহাতে দুর্বলের ওপর অবিচার মেনে নেওয়া হবে না। আইন সবার জন্য সমান। বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করতে চাই।
গতকাল শনিবার বিকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা চাই। এবার দেশ পুনর্গঠন করতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
পুলিশ কী বলছে
তবে নির্বাচন উত্তর সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো ধরনের চাপের কাছে মাথানত না করে নিরপেক্ষভাবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাঠ পর্যায়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে মামলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচনের পর যারা জয়ী হন এবং যারা পরাজিত হন তাদের মধ্যে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়- এটা আমাদের পুরোনো অভ্যাস। তাই এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। নির্বাচনের আগে ৪ দিন এবং নির্বাচনের পরে ২ দিনসহ মোট সাত দিন সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনী ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় শনিবার পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। তবে এরপরও কোনো অসুবিধা হবে না। কারণ সবকিছু বিবেচনায় রেখেই নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হয়েছে।
নির্বাচন উত্তর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষ প্রসঙ্গে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, কিছু জায়গায় সংঘর্ষ হয়েছে। যেসব জায়গায় এমনটা হয়েছে আমাদের পক্ষ থেকে দেশের সব থানায় বলে দেওয়া হয়েছে কে কোন দলের তা বিবেচনায় না নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মামলা নিতে। যাতে কোনোভাবেই পুলিশের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। কারও প্রতি যেন পক্ষপাতমূলক আচরণ করা না হয় সেই দিকটা বিশেষভাবে লক্ষ রাখা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের প্রধান দুটি দলের নেতৃবৃন্দের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আশার কথা দুটি দলই নির্বাচন পরবর্তী সংঘাত-সংঘর্ষের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু তারপরও স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না বলে কিছু ঘটনা ঘটছে।
যে কোনো নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করা হয়, এ প্রসঙ্গে খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, যারা নির্বাচনে পরাজিত হয় তারাও সংখ্যালঘু হয়ে যায়। তারাও প্রতিপক্ষের দ্বারা হামলা-নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন। তাই তাদের বিষয়টিও বিশেষভাবে লক্ষ রাখা হচ্ছে।
নির্বাচন পরবর্তী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের যেকোনো ঘটনার বিষয়ে পুলিশের সাইবার মনিটরিং টিম সক্রিয় আছে। যেকোনো ধরনের ঘটনার সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সাইবার টিম সঙ্গে সঙ্গে তা যাচাই করছে। মিথ্যা হলে তা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর সত্য হলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/এনএ