হঠাৎ কেন যুদ্ধে জড়াল পাকিস্তান-আফগানিস্তান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। গত সপ্তাহে আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী হামলার পাল্টা জবাবে কাবুল ও কান্দাহার প্রদেশে পাকিস্তানের

2026-02-27T19:01:41+00:00
2026-02-27T19:01:41+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
হঠাৎ কেন যুদ্ধে জড়াল পাকিস্তান-আফগানিস্তান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:০১ পিএম 
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা। সংগৃহীত ছবি
তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। গত সপ্তাহে আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী হামলার পাল্টা জবাবে কাবুল ও কান্দাহার প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলা চালানোর পরই এই ঘোষণা দেয় দেশটির সেনাবাহিনী।

প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এই সহিংসতার ফলে কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে।

হামলার পরপরই পাকিস্তানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ তার এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, আমাদের ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এখন থেকে তোমাদের ও আমাদের মধ্যে লড়াই হবে সরাসরি যুদ্ধ।

বৃহস্পতিবারের হামলা প্রসঙ্গে পাকিস্তান জানিয়েছে যে, আফগান তালেবানদের কথিত সীমান্ত আক্রমণের জবাবে তারা একটি প্রতিশোধমূলক অভিযান পরিচালনা করেছে, যেখানে ১৩০ জনেরও বেশি তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

আফগান তালেবানরা বেশ কিছু সীমান্ত পোস্টে হামলা চালিয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ‘অপারেশন গজব লিল হক’ শুরু করা হয়।

গত কয়েক মাস ধরেই এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত অক্টোবরে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন সৈন্য, বেসামরিক নাগরিক এবং সন্দেহভাজন উগ্রবাদী নিহত হয়। 

কাবুলে বেশ কিছু বিস্ফোরণের ঘটনার পর এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়, যার জন্য আফগান কর্মকর্তারা পাকিস্তানকে দায়ী করেছিলেন। সেই সময় ইসলামাবাদ উগ্রবাদীদের আস্তানা লক্ষ্য করে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে গভীর পর্যন্ত বিমান হামলা চালিয়েছিল।

কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি মূলত কার্যকর থাকলেও, উভয় পক্ষই মাঝেমধ্যে সীমান্তে গুলি বিনিময় করেছে। নভেম্বরে কয়েক দফা শান্তি আলোচনা চললেও কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

গত রোববার পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আফগান সীমান্ত বরাবর পুনরায় হামলা চালিয়ে দেশটির অন্তত ৭০ জন উগ্রবাদীকে হত্যার দাবি করে।  

আফগানিস্তান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে, হামলায় নারী ও শিশুসহ বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। 

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পূর্ব আফগানিস্তানের একটি মাদ্রাসা এবং বেশ কিছু বসতবাড়িসহ বিভিন্ন বেসামরিক এলাকা লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে যে, এই হামলা আফগানিস্তানের আকাশসীমা এবং সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন।

দুই দেশের সীমান্ত উত্তেজনার কারণ কী?

এই ধারাবাহিক হামলাগুলো একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। গত অক্টোবরের সীমান্ত সংঘর্ষে কয়েক ডজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছিল, যা ২০২১ সালে তালেবান কাবুল দখল করার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ লড়াই।

২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনকে পাকিস্তান স্বাগত জানিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন যে, আফগানরা দাসত্বের শিকল ভেঙেছে। তবে রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামাবাদ দ্রুতই বুঝতে পারে যে তালেবানরা তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সহযোগিতামূলক আচরণ করছে না।


বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে যে, আফগানিস্তান তাদের মাটিতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) নামে পরিচিত সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে আশ্রয় দিচ্ছে। রয়টার্সের উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা’ জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছরই এদের সশস্ত্র তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং টিটিপি ও বেলুচ বিদ্রোহীদের হামলার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।

পাকিস্তানের ওপর দায়

ইসলামাবাদ জানিয়েছে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে উগ্রবাদী সহিংসতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটি এই সহিংসতার বড় অংশের জন্য টিটিপি এবং বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে থাকে। টিটিপি আফগান-তালেবান থেকে পৃথক একটি সংগঠন হলেও, দলটির সাথে তাদের গভীর আদর্শিক, সামাজিক এবং ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৭ সালে পাকিস্তানের উপজাতীয় জেলাগুলোতে টিটিপি-র আত্মপ্রকাশ ঘটে।

আফগান-তালেবান বারবার অস্বীকার করেছে যে তারা তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালানোর অনুমতি দেয়।

পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা’-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পার্ল পান্ডিয়া আল জাজিরাকে বলেছেন যে, আফগানিস্তানের সঙ্গে অরক্ষিত সীমান্ত, যোদ্ধাদের সামরিক চাপের মুখে পিছু হটে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

তিনি আরও যোগ করেন, আফগান-তালেবান সম্ভবত টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক। এর কারণ যেমন তাদের পুরনো সখ্যতা, তেমনি ভয় আছে যে টিটিপি যোদ্ধারা দলত্যাগ করে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স’ (আইএসকেপি)-এ যোগ দিতে পারে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারিও জোর গলায় বলেছিলেন যে, পাকিস্তান শান্তি ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না। 

তিনি আরও বলেন, আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়া হবে সর্বাত্মক এবং চূড়ান্ত। যারা আমাদের শান্তিকামী হওয়াকে দুর্বলতা ভাববে, তাদের কঠোর জবাবের মুখোমুখি হতে হবে এবং কেউ আমাদের নাগালের বাইরে থাকবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ বলেছেন যে, পাকিস্তানের জনগণ এবং সশস্ত্র বাহিনী দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সর্বদা প্রস্তুত।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে শরীফ দেশের নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যেকোনো আগ্রাসী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করতে আমাদের বাহিনী সম্পূর্ণ সক্ষম। প্রিয় মাতৃভূমির প্রতিরক্ষার বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না এবং প্রতিটি আগ্রাসনের যোগ্য জবাব দেওয়া হবে।

পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে?

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে একটি সরাসরি যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। এর আগে, পাকিস্তানের বিমান হামলার পর তালেবান সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিল, উপযুক্ত সময়ে বুঝে-শুনে যথাযত জবাব দেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি সীমান্ত এলাকায় বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা বা সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কাগজে-কলমে দুই পক্ষের শক্তির মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। ১ লাখ ৭২ হাজার সদস্য নিয়ে তালেবানের জনবল পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর তিন ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম।

যদিও তালেবানদের কাছে অন্তত ৬টি বিমান এবং ২৩টি হেলিকপ্টার রয়েছে বলে সূত্রে জানা যায়। তবে সেগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা নেই। এছাড়া তাদের কোনো শক্তিশালী যুদ্ধবিমান বা কার্যকর বিমানবাহিনী নেই।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে ৬ লক্ষাধিক সক্রিয় সেনা রয়েছে। এছাড়াও তাদের কাছে ছয় হাজারের বেশি সাঁজোয়া যুদ্ধযান এবং ৪০০-এর বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে। উল্লেখ্য যে, দেশটি একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।

সময়ের আলো/এআর
  বিষয়:   যুদ্ধ  পাকিস্তান  আফগানিস্তান 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: