কিলোমিটারজুড়ে গাড়ির সারি, সীমিত বিক্রিতে ক্ষুব্ধ চালকরা

অলিউল ইসলাম

জাতীয়

রাজধানীর বেশিরভাগ পাম্পেই মিলছে না অকটেন ও ডিজেল। যেসব পাম্প খোলা রয়েছে সেগুলোর সামনে শনিবার ভোর থেকে তেল নিতে যানবাহনের

2026-03-08T01:08:39+00:00
2026-03-08T01:08:39+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
পেট্রোল পাম্পে তেল সংকট
কিলোমিটারজুড়ে গাড়ির সারি, সীমিত বিক্রিতে ক্ষুব্ধ চালকরা
অলিউল ইসলাম
প্রকাশ: রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ১:০৮ এএম 
রাজধানীর বেশিরভাগ পাম্পেই মিলছে না অকটেন ও ডিজেল। ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর বেশিরভাগ পাম্পেই মিলছে না অকটেন ও ডিজেল। যেসব পাম্প খোলা রয়েছে সেগুলোর সামনে শনিবার ভোর থেকে তেল নিতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। তেজগাঁও, মহাখালী, বিজয় সরণি ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার পেট্রোল পাম্পে ট্রাক, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় অনেকেই অতিরিক্ত তেল কিনতে পাম্পে ভিড় করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল কেনার সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পাশাপাশি পাম্পগুলোতে অনিয়ম ঠেকাতে আজ থেকেই ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ দুই লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ১০ লিটার। মাইক্রোবাস দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত তেল নিতে পারবে। এ ছাড়া পিকআপ ভ্যান ও লোকাল বাস সর্বোচ্চ ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক সর্বোচ্চ ২২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি নিতে পারবে।
রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালক সরকারের নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী তেল পাননি। বেশিরভাগ পাম্প থেকেই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে অনেককে। তেল না পাওয়ায় অনেক জায়গায় চালক ও পাম্প কর্মীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হতেও দেখা গেছে। এ সময় গ্রাহকরা পেট্রোল পাম্পগুলোর ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

তেজগাঁওয়ের বেশ কয়েকটি পাম্প ঘুরে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা যায়, সেখানে সীমিত পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে। মোটরসাইকেল প্রতি প্রায় ৩০০ টাকার এবং প্রাইভেট কারসহ অন্যান্য যানবাহনকে প্রায় ১৫০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঠিক সামনে অবস্থিত এই পাম্পটির সামনে সকাল থেকেই বিশাল সারি দেখা যায়। পাম্পটির সামনে থেকে শুরু হওয়া সিরিয়াল মহাখালীর রেলগেট পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ জাহাঙ্গীর গেট থেকে শুরু হয়ে রেলগেট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটারের বেশি জায়গাজুড়ে রয়েছে যানবাহনের সারি। একই সঙ্গে মাঝখানে আরেকটি লাইন নাখালপাড়া পর্যন্ত চলে গেছে। সব মিলিয়ে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তেলের জন্য অপেক্ষমাণ গাড়ির লাইন।

তেল নিতে এসে মোটরসাইকেল চালক রমজান সরদার বলেন, অনেকক্ষণ হলো লাইনে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু এতক্ষণ অপেক্ষা করার পরও নিশ্চিত নই তেল পাব কি না। অনেক সময় পাম্পে গিয়ে শুনতে হচ্ছে তেল শেষ হয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার মাত্র ২০০ বা ৩০০ টাকার তেল দিয়ে দিচ্ছে। এত কম তেল নিয়ে আমাদের চলা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কাজের প্রয়োজনে সারাদিন মোটরসাইকেল চালাতে হয়। কিন্তু এখন প্রায় প্রতিদিনই পাম্পে এসে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। সরকার যদি সরবরাহ বাড়াতে না পারে তা হলে আমাদের মতো চালকদের বড় সমস্যায় পড়তে হবে।

ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের এক প্রতিনিধি বলেন, গত দুদিন ধরে পরিস্থিতি খুব অস্বাভাবিক হয়ে গেছে। সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি মানুষ তেল নিতে আসছেন। আমাদের কাছে যে পরিমাণ তেল থাকে, তা দিয়ে এত চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। অনেকেই ট্যাঙ্ক ফুল করতে চাইছেন, এতে মজুদ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত পরিমাণে তেল দিচ্ছি। কিন্তু তবু সবাইকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। আমরা চাই দ্রুত সরবরাহ বাড়ানো হোক, তা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

দুপুর ২টার দিকে আসাদগেট-সংলগ্ন সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনের সামনে দেখা যায়, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন মোহাম্মদপুর টাউন হল পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। এর উল্টোদিকে তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনেও একই অবস্থা। সেই লাইনের শেষ প্রান্ত গণভবন এলাকা পার হয়ে গেছে। দুই স্টেশনের বিক্রয়কর্মীরা জানান, অনেক চালকই আতঙ্কে ট্যাঙ্ক ফুল করে তেল নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে কথা হয় মাইক্রোবাস চালক পরিমল বসুর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখনও সামনে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, তাই তেল ছাড়া চলা সম্ভব না। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে কাজ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় যাত্রীরা অপেক্ষা করতে চায় না। এতে আমাদের আয়ও কমে যাচ্ছে। তেলের জন্য এত সময় নষ্ট হলে দিনে কয়েকটি ট্রিপ কম হয়ে যায়। সরকার যদি দ্রুত পরিস্থিতি সামাল না দেয় তাহলে পরিবহন খাতেও বড় প্রভাব পড়বে। সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনের সামনে কথা হয় রাইড শেয়ারিং চালক মাহমুদুল ইসলামের সঙ্গে। 

তিনি বলেন, আমাদের কাজটাই হচ্ছে সারাদিন শহরে ঘুরে যাত্রী বহন করা। কিন্তু এখন তেল পাওয়া নিয়ে এত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে যে কাজ করা খুব কঠিন হয়ে গেছে। দুই লিটার তেল দিচ্ছে সমস্যা নেই। কিন্তু তার জন্য দুই-তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে ট্রিপ মারব কখন? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মতো চালকদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।

সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনের ম্যানেজার শঙ্কর বলেন, প্রত্যেকটি পেট্রোল পাম্পই এখন একই ধরনের চাপের মধ্যে আছে। তেলের সংকটের কারণে আমরা নিয়মিত সরবরাহ পাচ্ছি না। কিন্তু গ্রাহকের সংখ্যা হঠাৎ করে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অনেকেই আতঙ্কে এসে ট্যাঙ্ক ফুল করতে চাইছেন। এতে খুব দ্রুত মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি সবার মধ্যে সীমিত পরিমাণে তেল দিতে। কিন্তু সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।

কল্যাণপুরের খালেক স্টেশন সার্ভিস পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন মোটরসাইকেল চালকরা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা নাজমুল হক চৌধুরী জানান, গত শুক্রবার রাতে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তিনি পেট্রোল পাননি। তাই শনিবার সকালে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত দুই লিটার অকটেন পেয়েছেন। কিন্তু সেই তেল কিনতেই তাকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। যা নিয়ে চরম বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, গত বৃহস্পতিবার থেকেই তেলের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। সাধারণত একটি পাম্পে ১৫ থেকে ২০ হাজার লিটার পর্যন্ত তেল মজুদ থাকে। কিন্তু গত শুক্রবার ও তার আগের দিন অনেক চালক হঠাৎ করে ট্যাঙ্ক ফুল করে তেল কিনে নেওয়ায় দ্রুত সেই মজুদ শেষ হয়ে যায়। আগে যেখানে অনেকেই ১০০ বা ২০০ টাকার তেল নিতেন, সেখানে আতঙ্কের কারণে প্রায় সবাই পুরো ট্যাঙ্ক ভর্তি করে ফেলেন। ফলে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং শনিবার থেকে সংকটের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। 
তিনি বলেন, আগামীকাল ৯ মার্চ আরও দুটি ভ্যাসেল দেশে পৌঁছবে। আজ রোববার থেকেই ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তার কোনো যুক্তি নেই। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে। কেউ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনার চেষ্টা করবেন না।

মন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে দেশে তেলের অভাব রয়েছে। আমরা বিকল্প উৎস থেকেও তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছি। রেশনিং করা হয়েছে শুধু সতর্কতার জন্য। যুদ্ধ কতদিন চলবে তা কেউ জানে না, তাই আমরা আগেভাগে প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু মানুষ এই সিদ্ধান্তকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে বেশি করে তেল কিনতে শুরু করেছে। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। কোনো পাম্প যদি খুব দ্রুত সব তেল বিক্রি করে ফেলে তাহলে ওই দিন আর তেল পাবে না। পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেব।


  বিষয়:   পেট্রোল পাম্প  তেল সংকট 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: