অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল পেরিয়ে নির্বাচনের পথ ধরে ২০ মাস পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মধ্য দিয়ে দেশে আবার শুরু হয়েছে সংসদীয় গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। তবে এ যাত্রার সূচনাতেই রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিতর্কের আবহ দেখা যায়। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংসদের কার্যক্রম শুরু হলেও রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে বিরোধী জোটের বিক্ষোভ, স্লোগান ও ওয়াকআউট সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনকে উত্তপ্ত করে তোলে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন, বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি গঠন এবং সংসদের সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পন্নের মধ্য দিয়ে নতুন সংসদের কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও স্থাপন করা হয়।
অধিবেশনে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। অধিবেশনে শোক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। ওই অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সবশেষ রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর অধিবেশন আগামী রোববার বেলা ১১টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্বোধনী ভাষণ দেন। পরে স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ বিগত দিনে পরলোকগমনকারী সংসদ সদস্য ও জাতীয় নেতাদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন সংসদনেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের সাংসদরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান।
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তারেক রহমান এই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে প্রবেশ করেন। অধিবেশনের শুরুতে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মাওলা কার্যক্রমের সূচনা করেন। তারপর বেলা ১১টা ৫ মিনিটে কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। এরপর সূচনা বক্তব্য রাখেন সংসদনেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি একাত্তর সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত আন্দোলন সংগ্রামে সব শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, দেশে কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। সংসদ নেতাসহ অধিবেশন কক্ষ যখন ভরপুর সেই সময়টিতে স্পিকারের চেয়ার ফাঁকা ছিল। এ সময় সংসদনেতা তারেক রহমান সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসনকে সভাপতি হিসেবে নাম প্রস্তাব করেন। এ প্রস্তাবে বিএনপির মহাসচিব স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণ সমর্থন জানান।
এরপর বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাবকে সমর্থন জানান। তিনি বলেন, আমরা এ নামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। তবে প্রস্তাবটি নিয়ে আগে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করলে ভালো হতো। এমপিরা টেবিল চাপড়ে তাতে সায় দিলে সরকারি দলের প্রথম সারি থেকে খন্দকার মোশাররফ হোসেন উঠে যান। এরপর অধিবেশ কক্ষ থেকে বের হয়ে হুইল চেয়ারে করে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করতে চতুর্থ তলায় যান তিনি। এ সময়ে সভাপতির আগমন বার্তা ঘোষণা করা হয়। বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্পিকারের আসনে বসার পর এমপিরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিবাদন জানান। তিনি শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন করেন।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদের অধিবেশনে আধা ঘণ্টার জন্য বিরতি দেওয়া হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতি সংসদ ভবনে তার কার্যালয়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান। পরে দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ কক্ষে প্রবেশ করে তার আসনে বসেন। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে স্পিকারের মাইকে শব্দ হচ্ছিল না। এ কারণে অধিবেশনের কাজ শুরু করতে একটু দেরি হয়। প্রায় তিন মিনিট পরে একটি হ্যান্ড মাইকে বক্তব্য দিতে শুরু করেন স্পিকার।
এ সময় সংসদ সদস্যদের অনেকেই দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানান, তারা বক্তব্য শুনতে পাচ্ছেন না। তখন স্পিকার যান্ত্রিক গোলোযোগের কথা এবং সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। এর মধ্যে জোহরের আজান শুরু হলে ২০ মিনিটের জন্য বিরতি দেওয়া হয়।
এরপর দুপুর দেড়টার একটু পরেই সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। আর এ সংসদ গণতন্ত্রের প্রতীক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন। স্পিকার বলেন, বিভিন্ন সময় স্বৈরশাসকের আগমন ঘটেছে। বাংলাদেশের জনগণ লড়াই করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্টদের বিদায় দেওয়া হয়েছে।
এ অভ্যুত্থানে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্পিকার আরও বলেন, জনগণ সংসদের কার্যক্রম দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়পক্ষ জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করবে বলে আশা করেন স্পিকার। নিরপেক্ষতার জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ ত্যাগ করেছেন জানিয়ে স্পিকার বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ, এই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।
অধিবেশন চলাকালে বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতির আগমন বার্তা ঘোষণা করলে বিরোধীদলীয় সদস্যরা বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভের মধ্যেই বিউগলের সুর বেজে ওঠে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করে স্পিকারের ডান পাশে রাখা নির্ধারিত আসনের সামনে দাঁড়ান। তখন জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে এবং অধিবেশন কক্ষের মনিটরে জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হয়। এ সময় সরকার দলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালেও বিরোধী জোটের সদস্যরা নিজেদের আসনে বসে পড়েন। তখন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সংসদের কর্মকর্তারা জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিরোধী দলীয় সদস্যদের দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। তখন কেউ কেউ দাঁড়ালেও কয়েকজন সদস্য বসে ছিলেন। তবে কিছু সময় পর জামায়াত জোটের সদস্যদের প্রতিবাদ বন্ধ রেখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
জাতীয় সংগীত পরিবেশন শেষে নির্ধারিত আসনে বসেন রাষ্ট্রপতি। অন্যদিকে ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’, ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ কর’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা। তারা রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে ‘খুনি’, ‘কিলার চুপ্পু’, ‘ফ্যাসিস্ট চুপ্পু’, ‘গেট আউট চুপ্পু’ বলতে থাকেন। এ সময় স্পিকার তাদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বারবার অনুরোধ জানান। আর রাষ্ট্রপতি তার জন্য নির্ধারিত ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন।
এ হট্টগোলের মধ্যে বিএনপির কয়েকজন এমপি বলতে থাকেন, আপনারা কাজটি ঠিক করছেন না, রাষ্ট্রপতি অর্ধেক মানছেন, অর্ধেক মানছেন না। তাকে অসম্মান করছেন। সরকার দলীয় অধিকাংশ সদস্য চুপচাপ বসে ছিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে তার পাশে থাকা এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে তাদের দলের সদস্যরা স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় তারা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ-গণতন্ত্র একসঙ্গে চলবে না’, ‘ফ্যাসিবাদের দোসররা, হুঁশিয়ার সাবধান’। তারা টেবিল চাপড়াতে ও চিৎকার করতে থাকেন। বিক্ষোভকালে মাইক ছাড়াই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচমেন্ট, পদত্যাগ ও গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান মাইক ছাড়াই বলেন, এই রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের সহযোগী, দালাল। এই সংসদে আমরা তার ভাষণ মেনে নিতে পারি না। এ পর্যায়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ আসন ছেড়ে রাষ্ট্রপতির ডায়াসের দিকে তেড়ে যান। কিন্তু তাকে বাধা দেন বিরোধীদলীয় উপনেতা। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে বিরোধীদলীয় সদস্যদের বাইরে নিয়ে যান। প্রায় চার মিনিট অচলাবস্থার পর রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ শুরু করেন। এর মধ্যেও বিরোধী দলের বিক্ষোভ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে স্লোগান দিতে দিতে বেরিয়ে যান বিরোধী দলীয় সদস্যরা। পরে রাষ্ট্রপতি তার নির্ধারিত ভাষণ শেষ করে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। পরে স্পিকার আগামী রোববার বেলা ১১টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করেন।
এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া সংবিধান অনুযায়ী একটি বাধ্যবাধকতা। আমরা সংবিধানের বিধান ও জাতীয় সংসদের রেওয়াজ অনুসরণ করতে চাই। দয়া করে আপনারা খারাপ কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন না। তবে স্পিকারের আহ্বানের মধ্যেই বিরোধী দলের সদস্যরা স্লোগান দিতে থাকেন। সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কক্ষে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে অধিবেশন পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে নতুন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাদের নাম ঘোষণা করেন।
ঘোষিত তালিকায় রয়েছেন ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির এমপি মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা-২ আসনে বিএনপির এমপি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নরসিংদী-১ আসনে বিএনপির এমপি আব্দুল মইন খান, কুমিল্লা-৬ আসনে বিএনপির এমপি মোহাম্মদ মনিরুল হক চৌধুরী এবং রংপুর-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর এমপি এটিএম আজহারুল ইসলাম। ঘোষণায় বলা হয়, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে বৈঠকে উপস্থিত সভাপতিমণ্ডলীর তালিকায় যার নাম শীর্ষে থাকবে তিনি স্পিকারের আসন গ্রহণ করবেন। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালির অংশ হিসেবে প্রতিটি সংসদেই সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনয়ন দেওয়া হয়। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে এই সদস্যরা পর্যায়ক্রমে অধিবেশন পরিচালনা করেন।
স্পিকারের মাইকে গোলযোগ : জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রথমবার বক্তব্য দিতে গিয়ে মাইক বিভ্রাটে পড়েন নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একপর্যায়ে জোহরের নামাজের আজান শুরু হলে তিনি ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশনের বিরতি ঘোষণা করেন। সে সময় স্পিকারের হাতে একটি হ্যান্ডমাইক দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদের অধিবেশনে আধঘণ্টার জন্য বিরতি ছিল। এ সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ ভবনে তার কার্যালয়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান।
পরে দুপুর ১২টা ৫৭ মিনিটে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার আসনে বসেন। এর আগে তিনি অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সংসদ নেতা তারেক রহমানসহ অন্যান্য সব সংসদ সদস্য টেবিল চাপড়ে নতুন স্পিকারকে অভিনন্দন জানান। এর পরে দিনের কর্মসূচি শুরু করার আগে স্পিকার নিজের হাতে মাইক অন করলেও তা কাজ করছিল না। এ সময় সংসদ সচিব কানিজ মওলাসহ অন্য কর্মকর্তারা তৎপর হয়ে ওঠেন। বারবার মাইকে টোকা দিয়ে দেখা হয়, কিন্তু মাইক কাজ করেনি।
পরে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মসের এক সদস্য স্পিকারের কাছে আসেন। পরে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলাও চেয়ার ছেড়ে উঠে স্পিকারের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় একটি হ্যান্ডমাইক তার কাছে রাখা হয়।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে স্পিকার হাফিজ বলেন, যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে না। অনভ্যস্ত সংসদ গণতান্ত্রিক বক্তব্য শুনতে অভ্যস্ত নয়। সে জন্য একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। আমার মাইক অন না, হ্যান্ডমাইকে কথা বলছি। মূল মাইকটি অকেজো। একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। আশা করি শিগগিরই এ অবস্থার অবসান হবে।
হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে হাফিজ উদ্দিন বলেন, আমাকে নির্বাচিত করায় আমি প্রত্যেক সদস্যদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ১৭ বছর পর আমরা একটা কার্যকর সংসদ পেয়েছি।
এ সময় স্পিকারের শুরুর বক্তব্য সংসদ সদস্যদের অনেকেই শুনতে পাচ্ছিলেন না। সংসদ নেতাসহ অনেককে হেডফোন দিয়ে কথা শোনার চেষ্টা করতে দেখা যায়। স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন জামায়াতের সাংসদ সদস্য সাইফুল আলম মিলন।
তিনি দাঁড়িয়ে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আপনার কোনো কথা শুনছি না।’ স্পিকার বলেন, ‘ধৈর্য ধরেন। যাত্রিক ত্রুটি হয়েছে। দুই মিনিটের মধ্যে যাত্রিক ত্রুটি ঠিক হয়েছে যাবে।’ এই সময়ে জোহরের আযান শুরু হলে স্পিকার ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন।
সরকারি দলের কে কোথায় বসলেন : ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম সারিতে প্রথম আসনে বসেছেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ নেতার পাশের আসন দলের মহাসচিব, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপরে রয়েছে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। পরের আসনগুলোর মধ্যে পর্যায়ক্রমে নির্ধারিত হয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের জন্য।
প্রথম সারির মাঝের আসনে বসেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, বন ও পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন (কায়কোবাদ), ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং জয়নাল আবদিন।
সংসদ নেতার ঠিক পেছনে দ্বিতীয় সারিতে বসেছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তার পাশে বসেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এরপরে পর্যায়ক্রমে বসেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক, ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান, আবদুস সালাম পিন্টু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মজিবর রহমান সরওয়ার, আমান উল্লাহ আমান, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, শাহজাহান চৌধুরী, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, এ কে এম ফজলুল হক মিলন, গণঅধিকার পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল হক নুর, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান), বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর ও হুইপ এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু।
পাঁচ সংসদীয় কমিটি গঠন : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনে কার্য উপদেষ্টাসহ পাঁচটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে এসব কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং কণ্ঠভোটে তা অনুমোদন পায়।
কার্য উপদেষ্টা কমিটি ও সংসদ কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন স্পিকার। অন্যদিকে বিশেষ কমিটি, বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত কমিটি এবং বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটির প্রস্তাব দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। পরে সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে সেগুলো অনুমোদিত হয়।
কার্য উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। কমিটির সদস্যরা হলেন সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, নূরুল ইসলাম মনি, আসাদুজ্জামান, সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, এ টি এম আজহারুল ইসলাম, নাহিদ ইসলাম ও নওশাদ জামির।
সংসদ কমিটি : সংসদ কমিটির সভাপতি নূরুল ইসলাম মনি। সদস্যরা হলেন— রাকিবুল ইসলাম, মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু, কায়ছার আহমদ, শহীদুল ইসলাম, নায়াব ইউসুফ আহমেদ, জাহাঙ্গীর হোসেন, অলি উল্লাহ, সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সাইফুল আলম ও আবুল হাসনাত।
১৩৩ অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় বিশেষ কমিটি : অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করতে ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির সভাপতি জয়নাল আবদিন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমদ, সালাহউদ্দিন আহমেদ, নূরুল ইসলাম মনি, আসাদুজ্জামান, এম ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, আব্দুল বারী, নওশাদ জামির, মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান ও জিএম নজরুল ইসলাম। স্পিকার এ কমিটির প্রস্তাব ভোটে দিলে সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে তা অনুমোদিত হয়।
বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত কমিটি : বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সদস্যরা হলেন সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, কায়সার কামাল, মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নূরুল ইসলাম মনি, জয়নাল আবদিন ফারুক ও নাহিদ ইসলাম। বিরোধী দল থেকে আরও একজন সদস্য পরে মনোনীত করা হবে বলে জানানো হয়। পরে এ কমিটিও কণ্ঠভোটে অনুমোদন পায়।
বেসরকারি সদস্যদের বিল সম্পর্কিত কমিটি : বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি মো. শাহজাহান। সদস্যরা হলেন আসাদুজ্জামান, আমান উল্লাহ আমান, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, তাহসিনা রুশদী, নওশাদ জামির, শাহজাহান চৌধুরী, নুরুল ইসলাম বুলবুল ও আখতার হোসেন। স্পিকার এ কমিটির প্রস্তাবও ভোটে দিলে তা সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।
১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন : এর আগে অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা আইন সংশোধন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ।
এ ছাড়া শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট সংশোধন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সংশোধন, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী সংশোধন এবং জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের নিরাপত্তা রহিতকরণ অধ্যাদেশও তালিকায় রয়েছে। সরকারি চাকরি, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট, ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক, ভোটার তালিকা, স্থানীয় সরকার, জাতীয় সংসদের নির্বাচন এলাকা সীমানা নির্ধারণ, রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল সংশোধন, সিভিল কোর্টস সংশোধন, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর সংশোধন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশোধনের একাধিক অধ্যাদেশও উত্থাপন করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট দুটি অধ্যাদেশও কার্যসূচিতে রাখা হয়েছে। এগুলো হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি তহবিল অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬। এ ছাড়া মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক, বাংলাদেশ বেসরকারি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, বাংলাদেশ গ্যাস, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস সংশোধন, বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন সংশোধন এবং বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশও তালিকায় রয়েছে। এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে সংসদে সুপারিশ দেওয়ার জন্যই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এফআর