বাজারে এখন কোনো সবজির দাম জিগ্যেস করলে প্রায় সব দোকানিরই একই উত্তর, ‘মামা, একশ টাকা কেজি।’ একটু দর কষাকষি করলেও শেষ পর্যন্ত দাম এসে ঠেকে সেই একশতেই। যেন সবজির দামে এক অদৃশ্য সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাজার করা এখন সত্যিই কঠিন হয়ে উঠেছে।
একসময় যেখানে ভালো মানের এক কেজি চাল পাওয়া যেত ৮০ থেকে ৯০ টাকায়, সেখানে এখন প্রতি কেজি সবজি কিনতেই গুনতে হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা। শুধু সবজি নয়, ভোজ্য তেল, মুরগি, মাংস সবকিছুর দামই বাড়তির দিকে। সব মিলিয়ে বাজারে ঢুকলেই মধ্য ও নিম্নবিত্তদের মেজাজ গরম হয়ে উঠছে। অনেকের মতে, বৈশ্বিক সংকট বা সরবরাহ কমার কথা বলা হলেও এর পেছনে কোনো অদৃশ্য সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না সে প্রশ্নও উঠছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব ধরনের সবজির দামই এখন চড়া। আগে মাছ-মাংসের তুলনায় সবজি ছিল কিছুটা স্বস্তির জায়গা। কিন্তু এখন সেই স্বস্তিও নেই। বেশিরভাগ সবজিই বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকার আশপাশে বা তারও বেশি দামে।
শনিবার বাজারে বরবটি, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, করলা, পটোল, বেগুন, শজনে, কচুর লতি সবই প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। কিছু সবজি আবার এর চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছেÑ যেমন ধুন্দুল ও গোল বেগুন ১২০ টাকা, আর ক্যাপসিকাম ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
তবে কিছু সবজি একশর নিচে থাকলেও সেগুলোর দামও আগের তুলনায় ১০ থেকে ৩০ টাকা বেশি। পেঁপে ৬০ টাকা, মুলা ৮০ টাকা, শিম ৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৮০ টাকা, টমেটো ৫০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া লাউ প্রতি পিস ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কচুমুখী ৬০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ টাকায় মিলছে। অন্যদিকে শসা কেজিপ্রতি ৬০ টাকা, মাঝারি লেবু প্রতি হালি ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে কাঁচামরিচের দাম এখন তা ৪০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে রয়েছে। পেঁয়াজ ও আলুর দামও তুলনামূলক কম, পেঁয়াজ ৪০-৫০ টাকা এবং আলু ২০ টাকা কেজি।
বাজারে কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতা সাজিদ জাহান বলেন, ‘আজকে বাজারে এসে দেখি প্রায় সব সবজির দামই ১০০ টাকার কাছাকাছি। গত সপ্তাহেও এমন ছিল না, তখন কিছুটা নাগালের মধ্যে ছিল।’
অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, অনেক সবজির মৌসুম শেষ হয়ে আসছে, ফলে সরবরাহ কমে গেছে। পাশাপাশি জ্বালানির সংকটের কারণে পরিবহন খরচও বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে দামে। বিক্রেতা ফয়সাল হোসেন জানান, নতুন করে সবজি বাজারে উঠতে শুরু করলে দাম কিছুটা কমে আসবে।
শুধু সবজি নয়, ভোজ্য তেলের বাজারেও রয়েছে অস্থিরতা। বোতলজাত সয়াবিন তেল এখনও ঠিকমতো বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে ছোট বোতলগুলো অনেক দোকানেই নেই। কোথাও কোথাও খোলা তেল পাওয়া গেলেও তা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের দাবি, ডিলাররা সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে এ অবস্থায় প্রশাসনও বসে নেই। বাজারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুদ করা কয়েক লাখ লিটার ভোজ্য তেল জব্দ করেছে র্যাব। সংশ্লিষ্টদের জরিমানাও করা হচ্ছে।
এদিকে মাছ ও চালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। মাছ বিক্রেতা শফিক এবং চাল বিক্রেতা মিজান জানান, এসব পণ্যের দামে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে ডিমের দাম কিছুটা বেড়েছে, ফার্মের ডিম প্রতি ডজন এখন ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গরু ও খাসির মাংসের দামও কিছুটা বেড়েছে। গরুর মাংস এখন কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা, যা আগে ৭৫০-৭৮০ টাকার মধ্যে ছিল। বিক্রেতারা বলছেন, কুরবানির ঈদ পর্যন্ত এই দাম থাকতে পারে। খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকার মধ্যে।
মুরগির বাজারেও অস্থিরতা রয়েছে। সোনালি মুরগি এখনও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৩৯০ টাকা কেজি, যদিও কিছু দিন আগে তা ৪৫০ টাকায় উঠেছিল। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়।
ক্রেতা জাকারিয়া বলেন, ‘মুরগির দাম কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও অনেক বেশি। নিয়মিত মনিটরিং দরকার।’
খামারিরা বলছেন, বার্ড ফ্লুসহ বিভিন্ন রোগে মুরগির মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দাম বেড়েছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ) বলছে, পোলট্রি খাতে বার্ড ফ্লুসহ নানা রোগের আক্রমণ বেড়েছে। পোলট্রি খাত সংশ্লিষ্টরাও একই কথা বলছেন তাপমাত্রার ওঠানামার কারণে মুরগির উৎপাদন কমেছে, বিশেষ করে সোনালি মুরগির ক্ষেত্রে। এ ছাড়া জ্বালানি সংকটে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায়ও দামে কিছুটা প্রভাব পড়েছে।
তবে ফলের বাজারে এখনও স্বস্তি আছে। আমদানি থাকায় ফলের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। আপেল ৩০০-৩৪০ টাকা, কমলা ৩৪০ টাকা, মাল্টা ২৫০ টাকা এবং আঙুর ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে তরমুজ সহজলভ্য হওয়ায় ফলের চাহিদা কিছুটা কমেছে, তাই দামও বাড়ানো হয়নি।
এদিকে সরকারি হিসাবে মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে, আর খাদ্য খাতে তা নেমেছে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশে। তবে এপ্রিল মাসে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম আবার বাড়তে শুরু করায় নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
সব মিলিয়ে বাজারের এই অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তাদের দাবি, নিয়মিত মনিটরিং বাড়িয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা হোক এবং যেকোনো ধরনের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।