প্রতি বছর আড়ম্বরপূর্ণভাবে পালন করা হয় পুলিশ সপ্তাহ। রেওয়াজ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকদের কাছে পুলিশ সদস্যরা তুলে ধরেন তাদের বিভিন্ন চাওয়া ও প্রত্যাশা। তবে আশ্বাসেই আটকে থাকে সেসব দাবি।
তারপরও রেওয়াজ অনুযায়ী আসন্ন পুলিশ সপ্তাহে নিজেদের বিভিন্ন দাবির কথা তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। তবে অন্য সময়ের তুলনায় এবার তাদের দাবিগুলো কিছুটা ভিন্ন। বিভিন্ন স্তরের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায় আসন্ন পুলিশ সপ্তাহে পুলিশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সম্ভাব্য দাবির বিষয়ে।
এবার নিজেদের পেশাগত বিভিন্ন সমস্যাগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি সময়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ, প্রযুক্তি ও পেশাদারিত্বের উন্নয়নের বিষয়গুলো তুলে ধরা হতে পারে পুলিশ সপ্তাহে।
বিশেষ করে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে পুলিশের জোরালো ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তাব করা হতে পারে পৃথক ইউনিটের। দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, পাহাড় ও গাছ কাটার মতো পরিবেশ বিপর্যয়কর কর্মকাণ্ড রোধে পৃথক ‘পরিবেশ পুলিশ’-এর দাবি উত্থাপন হতে পারে।
প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রযুক্তি সম্পৃক্ত অপরাধ। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে। ব্ল্যাকমেইলিংসহ নানা ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছে মানুষ। তাই এবার স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব উঠতে পারে পুলিশ সপ্তাহে।
প্রতি বছরই পুলিশ সপ্তাহে পুলিশের পক্ষ থেকে ঝুঁকিভাতা, ছুটি ও পদোন্নতি নিয়ে দাবি তোলা হয়। জানা যায়, এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। এ সংক্রান্ত পুরোনো দাবিগুলোও নতুন করে উত্থাপিত হতে পারে পুলিশের পক্ষ থেকে।
ছুটি ও প্রণোদনা নিয়ে পুলিশের দাবি দীর্ঘদিনের। পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
তাদের মতে, সরকারের অন্যান্য বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বছরে সব মিলিয়ে প্রায় ১২৯ দিন ছুটি ভোগ করেন। কাজের ধরন ও চাপের কারণে পুলিশ সদস্যরা কখনো এ ছুটি ভোগ করতে পারেন না। তাই এ সময় কর্মকাল হওয়ায় পুলিশ সদস্যদের কমপক্ষে ৩০ দিন বা এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ ভাতা দেওয়ার দাবি তারা একাধিকবার পুলিশ সপ্তাহে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু সেই দাবি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
ঝুঁকিভাতা নিয়েও পুলিশের ভেতর অসন্তুষ্টি আছে। বর্তমানে কন্সস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ঝুঁকিভাতা থাকলেও তাদেও দাবি কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত ঝুঁকিভাতা চালু করা।
ব্যারাক নিয়েও পুলিশের অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় তাদের। পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটের জন্য জমি, নিজস্ব ভবন প্রতিষ্ঠা করা ও ব্যারাকভিত্তিক ইউনিটকে ভাড়া জায়গা থেকে সরিয়ে নিজস্ব স্থাপনায় নেওয়ার বিষয়টিও উত্থাপিত হতে পারে তাদের দাবির মধ্যে।
এ ছাড়া ট্রেনিং একাডেমিতে ভাতা চালু করা, নারী প্রশিক্ষণ সেন্টার বৃদ্ধি করা, পুলিশ সদস্যদের পোস্টিং (স্বামী-স্ত্রী একই কর্মস্থলে পদায়ন), এএসপি পদে নিয়োগ বিধি সংশোধন, সরকারিভাবে ট্রাফিক বক্স স্থাপন এবং নারী ট্রাফিকের জন্য নারীবান্ধব টয়লেট ফ্যাসিলিটিজ, বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালের মানোন্নয়ন, পুলিশের বাজেট দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ার প্রস্তাব, ফোর্স বৃদ্ধি করে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, একই পদে দীর্ঘদিন চাকরি করার পর অবসরের আগে পদোন্নতি দেওয়াসহ একাধিক প্রস্তাব ইতিপূর্বেও তুলে ধরা হয পুলিশ সপ্তাহে। এবারও এসব দাবিগুলো তুলে ধরা হতে পারে।
২০২৫ সালে পুলিশ সপ্তাহে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়েও দাবি তোলা হয়। রাজনৈতিক প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে আসার প্রসঙ্গটিও উত্থাপন করা হয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে। তবে এবার এই দাবি উত্থাপন করা হবে কি না সে বিষয়ে কারও কাছ থেকে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।
এবার পুলিশ সপ্তাহে দাবি তোলা হতে পারে পুলিশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত ছুটির অভাব, কাজের চাপসহ বিভিন্ন কারণে এরকম মানসিক চাপের ফলে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদস্যদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি উত্থাপিত হতে পারে পুলিশ সপ্তাহে।
নাগরিক সেবা বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাব করা হতে পারে ময়মনসিংহে পৃথক মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠনের এবং বগুড়ায় শিল্প পুলিশের জন্য একটি জোন স্থাপনের। এ ছাড়া রংপুর বিভাগে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং দুটি পুলিশ প্রশিক্ষণ সেন্টার (পিটিসি) গঠনেরও প্রস্তাব আসতে পারে।
আগামী ১০ মে শুরু হচ্ছে পুলিশ সপ্তাহ। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে চার দিনের পুলিশ সপ্তাহে প্যারেড অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান যুদ্ধাবস্থায় বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে এবার পুলিশ সপ্তাহে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে। সাত দিনের বদলে চার দিনে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হবে। এ ছাড়া কমানো হয়েছে ইভেন্ট ও অতিথির সংখ্যা। এমনকি পদকপ্রাপ্তদের সংখ্যাও কমিয়ে আনা হয়েছে।
তবে নিরাপত্তার স্বার্থে এবার ধাতব নির্মিত কলম নিয়ে কেউ অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতে পারবে না। সম্প্রতি পুরান ঢাকায় ‘পেন গান’ উদ্ধারের পর এই নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
সূত্রে জানা গেছে, এবারের পুলিশ সপ্তাহে ১১৫ জন সদস্য পদক পাচ্ছেন। এবার পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা আগের তুলনায় বেশি দেখা যেতে পাওে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাদ পড়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পুলিশের সম্মিলন অনুষ্ঠানটি এবার পুনরায় ফিরে আসছে। চার দিনের আয়োজনে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মেলন, আইজিপি সম্মেলন, পুনাক বার্ষিক সমাবেশ, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, শিল্ড প্যারেড ও আইজি’স ব্যাজ প্রদান অনুষ্ঠিত হবে। বৃষ্টি না হলে রাজারবাগ মাঠে প্যারেড অনুষ্ঠিত হবে।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের কারণে এবারে পুলিশ সপ্তাহের আয়োজন সংক্ষিপ্ত করা তবে। ব্যয় সংকোচন করে আয়োজন করা হবে সব অনুষ্ঠানের।
পুলিশ সপ্তাহে পুলিশের দাবি-দাওয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মাঠপর্যায় থেকে মতামত সংগ্রহ করে দাবি উত্থাপন করা হবে। তবে এখনও কিছু চূড়ান্ত করা হয়নি। এসব নিয়ে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
পূরণ হয় না দাবি : নিজেদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে এক বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছিল পুলিশ বাহিনী। পুলিশ সপ্তাহ-২০২৫ উপলক্ষে উত্থাপিত এসব দাবির একটিও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। এর পূর্ববর্তী বছরে উত্থাপিত দাবিগুলোও পড়ে আছে হিমাগারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল পুলিশ সদর দফতরে ওই প্রস্তাব পাঠায় পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। এতে বেতন কাঠামো, পদোন্নতি, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, অভ্যন্তরীণ তদন্তব্যবস্থা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সংস্কার এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলোতে বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালেও পুলিশ সপ্তাহে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। যার মধ্যে অন্যতম দাবিগুলো ছিলো পদোন্নতি জট নিরসন এবং সুপার নিউমারারি পদগুলো রেগুলার করা। নতুন পদ সৃষ্টি ও পদোন্নতি জট নিরসনের কিছু উপায়। দেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে নিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি মিশনগুলোতে প্রেষণে পুলিশ অফিসারদের নিয়োগ প্রদান। এ ছাড়া নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, গাড়ি কিনতে সুদমুক্ত ঋণ ও পরিদর্শক থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঝুঁকি ভাতা, নন-ক্যাডার পুলিশ সদস্যদের জন্য সুপার নিউমারারি পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি জট কমানোসহ পুরোনো দাবিগুলো তুলে ধরা হয়। কিন্তু ওইসব দাবির কোনটিই বাস্তবায়িত হয়নি।