
বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড)’র ফুল বাগানে হচ্ছে মৌ চাষ। ফুল বাগানের মাঝে স্থাপিত মৌ-মাছির বাসায় হাজারো মৌ-মাছির ভীড়। বাগানের ফুল সহ বার্ড ক্যাম্পাসের ফল গাছ থেকে সংগৃহীত মধু মৌমাছিরা এনে জমা করছে এখানে। আর এভাবেই দিনে দিনে বাক্স ভরে উঠছে মধুতে। বার্ড’এ লালমাই-ময়নামতি প্রকল্পের আওতায় হচ্ছে এই মৌ চাষ। আর এভাবেই সফল হচ্ছে প্রকল্পের উদ্যোক্তা আর চাষীরা। পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়ছে জেলাজুড়ে এই মৌচাষ প্রকল্পের পরিচিতি।
কুমিল্লা পদ্ধতির জনক, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড)’র প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আখতার হামিদ খানের গড়া প্রতিষ্ঠানে লালমাই-ময়নামতি প্রকল্প। সংক্ষেপে এবাএখা অর্থাৎ একটি বাড়ি একটি খামার।
সরেজমিন কুমিল্লা বার্ড ঘুরে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য সুত্রে জানা যায়, কুমিল্লার ঐতিহাসিক লালমাই-ময়নামতি পাহাড়। এই পাহাড়ের অংশবিশেষ জেলার কুমিল্লা সদর, সদর দক্ষিণ ও বুড়িচং এলাকায় অবস্থিত। আর এই পাহাড়ের কোটবাড়িতে রয়েছে কুমিল্লা বার্ড। এই বার্ড’র কার্যক্রমের একটি হচ্ছে লালমাই-ময়নামতি প্রকল্প সংক্ষেপে এবাএখা । প্রতিদিন বার্ডে আসছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশসহ সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ। কেউ আসছে এখানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ, সভা, সেমিনার’এ অংশ নিতে কেউবা আসে বার্ড পরিদর্শনে। আর লালমাই-ময়নামতি প্রকল্পের উদ্দ্যেক্তারা তাদের প্রকল্পের প্রচার প্রসারে বেছে নিয়েছেন বার্ড’র ফুল বাগান। কুমিল্লা বার্ড’র ফুল বাগান যে কোন সৌন্দর্য পিপাসুর নজর কাড়ে। আর এই বাগানে নানা রং-বেরংয়ের ফুলের মাঝে হাজারো মৌমাছির ভীড় দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে প্রতিদিন। এভাবেই অনেকটা মনের অজান্তেই প্রকল্পের প্রচার প্রসার ঘটছে নিরবে দেশ থেকে দেশান্তরে। কথা হয় কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড)’র লালমাই-ময়নামতি প্রকল্প (এবাএখা বার্ড অংশ)’র সহকারী প্রকল্প পরিচালক আনোয়ার হোসেন ভূইয়ার সাথে। তিনি জানান,২০১৭ সালের শেষ দিকে এই প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে। ৩১ জানুয়ারী কুমিল্লা বার্ডের ফুল বাগানে মৌমাছিসহ বাক্স বসানো হয়েছে। যদিও ফুল বাগানে বসানো হয়েছে তথাপি ফুল থেকে যতটা মধু আহরণ করবে তার চেয়ে বেশী মধু আহরিত হবে বার্ডের ক্যাম্পাসে থাকা আম,লিচুসহ অন্যান্য ফলের গাছ থেকে। তিনি আরো বলেন,ফুল বা ফলের উল্লেখিত গাছগুলো থেকে প্রতিটি বাক্সে ৮/১০ কেজির বেশী মধু সংগৃহীত হবেনা। তবে এটা যদি সরিষাসহ অন্যান্য উন্মুক্ত স্থানে হয় তবে তার চেয়ে বেশী মধু সংগ্রহ করতে পারবে। তিনি আরো জানান, সর্বোচ্চ এক মাসে চাষী তার বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করতে পারবে। তিনি আরো বলেন, এ প্রকল্পটির বিস্তৃতি লালমাই-ময়নামতি পাহাড় বিস্তৃত কুমিল্লার তিন উপজেলার ৮ টি ইউনিয়নের ৬৮টি গ্রামজুড়ে। দায়িত্বশীল ওই কর্মকর্তা আরো জানান,মৌ চাষ করে মধু উৎপাদনের লক্ষ্যেই লালমাই-ময়নামতি প্রকল্প। বার্ড সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় দক্ষ মৌচাষী সৃষ্টির মাধ্যমে মধু উৎপাদনে কার্যকর ভূমিকা রাখতেই এই উদ্দেশ্য। আর এই প্রকল্পের আওতায় চাষীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দক্ষ চাষী হিসেবে গড়ে তুলে আর্থিকভাবে স্বাভলম্বি করে তোলার লক্ষ্যে প্রকল্পটি এগিয়ে নিচ্ছেন তারা। আর সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে এ প্রকল্পের অধীনে কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড) ৩’শতাধিক ব্যক্তিকে মৌ চাষের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলে। পরবর্তীতে তাদের মাঝে বিনামূল্যে মৌমাছিসহ মৌচাক সরবরাহ করে। প্রকল্প পরিচালক ড.মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের আওতায় মৌচাষীদের শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়াও তাদের মাঝে বিনামূল্যে মৌমাছিসহ বাক্স সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত মধু বাজারজাতকরণেও সহযোগীতার হাত বাড়িয়েছে বার্ড। দেশের বিভিন্ন বৃহৎ ভোগ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসহ বার্ড নিজে তাদের সমবায়ী বিতরণ কেন্দ্রে এই প্রকল্পের আওতায় উৎপাদিত মধু বিক্রির সুযোগ করে দিবে। তিনি আরো বলেন, লালমাই-ময়নামতি প্রকল্পে সম্প্রতি প্রশিক্ষিত ৩’শতাধিক মৌচাষী তাদের সরবরাহকৃত মৌমাছি চাষ করে বাৎসরিক কমপক্ষে ৯ টনেরও বেশী মধু উৎপাদনে সক্ষম হবে। এছাড়াও প্রকল্পটির পরিধি আরো বাড়ানো চিন্তার কথাও তিনি জানান। উল্লেখ্য কুমিল্লা বার্ডে ফুলের বাগানে মৌচাষ ছাড়াও লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের অন্তর্গত কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের ২৬ টি, বারপাড়া ইউনিয়নের ১০টি, বাগমারা ইউনিয়নের ১টি, আদর্শ সদর উপজেলার কালিরবাজার ইউনিয়নের ৯টি, দূর্গাপুর উত্তর ইউনিয়নের ৩টি, বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের ৫টি, বাকশিমূল ইউনিয়নের ১১টি এবং ময়নামতি ইউনিয়নের ৩টি গ্রামে লালমাই-ময়নামতি প্রকল্পের আওতায় ৩’শ চাষী মধু চাষ করছে।