কয়েক দফা পিছিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে আগামীকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠছে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় এটি বড় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রকল্পের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় একনেক সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ১১ নম্বর কার্যতালিকায় রয়েছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, ‘আমরা সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। এখন সিদ্ধান্ত সরকারের। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে লবণাক্ততা কমবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার হবে। ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে দেশের কিছু এলাকা মরুকরণের ঝুঁকিতে পড়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশ উপকৃত হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। মৃতপ্রায় নদীগুলোতে প্রবাহ ফিরবে, কমবে লবণাক্ততা এবং কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
১৯৭৫ সালে ভারত পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর গঙ্গার পানি প্রত্যাহার শুরু হলে বাংলাদেশের পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর প্রভাবে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল নদীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী শুকিয়ে যায় এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে কৃষি, মৎস্য, নৌ-চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও তদারকির সুবিধার্থে প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে মূল অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার সøুইসগেট, নেভিগেশন লক, ফিশ পাস এবং রেলওয়ে সেতু থাকবে। পাশাপাশি প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া গড়াই, চন্দনা ও হিসনা অফটেক নির্মাণ, নদী পুনর্খনন, ড্রেজিং, রেগুলেটর ও বাঁধ নির্মাণ করা হবে। গড়াই-মধুমতি নদীতে ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার এবং হিসনা নদী সিস্টেমে ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনর্খনন করা হবে।
প্রকল্পটি দেশের চার বিভাগের ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হবে। এর আওতায় শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হবে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি বড় অনিশ্চয়তা রয়েছে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ফলে ফারাক্কা ব্যারাজ-সংক্রান্ত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাও প্রকল্পটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।