আগামী দুই বছরের মধ্যে চাঁদের বুকে মানুষের স্থায়ী ঘাঁটি (মুন বেস) গড়ার এবং পুনরায় নভোচারী পাঠানোর মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মহাপরিকল্পনা বড় ধরনের ধাক্কা খেল। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে এক পরীক্ষামূলক মহড়ার সময় ধনকুবের জেফ বেজোসের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ব্লু অরিজিন’-এর তৈরি বিশালাকার ‘নিউ গ্লেন’ রকেটটি আকস্মিকভাবে বিস্ফোরিত হয়েছে। এতে করে নাসার বহুল প্রতীক্ষিত ‘আর্টেমিস’ প্রকল্পের সময়সূচি গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ৯টায় পূর্বনির্ধারিত ‘হটফায়ার’ (ইঞ্জিন চালু রেখে স্থায়িত্ব পরীক্ষা) টেস্ট শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাথায় রকেটটিতে একটি প্রলয়ঙ্কারী বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে বিশাল এক অগ্নিকুণ্ড পুরো উৎক্ষেপণ মঞ্চকে (লঞ্চপ্যাড) গ্রাস করে নেয় এবং রকেটটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার (১১৫ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত ফোর্ট পিয়ার্স থেকেও রাতের আকাশ কমলা রঙে উদ্ভাসিত হতে দেখা গেছে। নিকটবর্তী কেপ ক্যানাভেরাল এবং কোকো বিচের আবাসিক বাড়িঘরগুলো এই বিস্ফোরণের ধাক্কায় কেঁপে ওঠে।
ব্লু অরিজিনের এই রকেটটি মূলত চাঁদের বুকে নাসার কার্গো ল্যান্ডার এবং নভোচারী বহনের ‘ব্লু মুন’ ল্যান্ডার উৎক্ষেপণের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের কথা ছিল। গত মঙ্গলবারই নাসা ঘোষণা করেছিল যে, চাঁদে ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিতব্য স্থায়ী ঘাঁটির প্রথম তিনটি মিশনের কাজ শুরু করতে ব্লু অরিজিনকে বড় চুক্তি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১৯৭২ সালের পর ২০২৮ সালে ‘আর্টেমিস-৪’ মিশনের মাধ্যমে চাঁদে প্রথম মানুষ নামানোর দৌড়ে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স-এর সাথে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল এই ব্লু অরিজিন।
বিস্ফোরণের পর নাসার নবনিযুক্ত প্রশাসক জারেড আইজ্যাকম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, মহাকাশ যাত্রা অত্যন্ত নির্মম এবং এমন ভারী প্রযুক্তির রকেট তৈরি করা অসাধারণ কঠিন কাজ। আমরা অংশীদারদের সাথে মিলে এই ‘অসংগতি’র একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত নিশ্চিত করব এবং আর্টেমিস ও চন্দ্রঘাঁটি প্রকল্পের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তা খতিয়ে দেখব।
ব্লু অরিজিনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস এক বার্তায় নিশ্চিত করেছেন, বিস্ফোরণে কোম্পানির কোনো কর্মকর্তা বা প্রকৌশলী আহত হননি, সবাই সম্পূর্ণ নিরাপদ আছেন। তবে ঘটনাটিকে একটি ‘খুবই কঠিন দিন’ বলে বর্ণনা করে তিনি বলেন, বিস্ফোরণের মূল কারণ কী, তা এখনই বলা সম্ভব নয়, তবে আমরা তা খুঁজে বের করতে কাজ শুরু করেছি। আমরা যা ভেঙেছে তা আবার পুনর্নির্মাণ করব এবং দ্রুত উড়াল দেব। কারণ এই মিশনটি সফল হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
জরুরি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাস্থল থেকে কোনো বিষাক্ত গ্যাস বা রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তবে বিস্ফোরণের দুই ঘণ্টা পরও লঞ্চপ্যাডে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে এবং একটি বিশালাকার লাইটনিং টাওয়ার ভেঙে পড়েছে।
ব্লু অরিজিনের এই ব্যর্থতায় তাদের প্রধান প্রতিযোগী স্পেসএক্স-এর প্রধান ইলন মাস্কও এক্স-এ মন্তব্য করেছেন। তিনি কিছুটা সহমর্মিতার সুরে বলেন, এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। রকেট বিজ্ঞান আসলেও অনেক কঠিন।
উল্লেখ্য, ব্লু অরিজিনের জন্য এটিই প্রথম ধাক্কা নয়। গত মাসেও তাদের নিউ গ্লেন রকেটের তৃতীয় উৎক্ষেপণের সময় আমাজনের ইন্টারনেট স্যাটেলাইট ভুল কক্ষপথে স্থাপন করার কারণে ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রকেটটির উড্ডয়ন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। গত সপ্তাহে পুনরায় অনুমতি পাওয়ার পর প্রথম এই স্থায়িত্ব পরীক্ষাতেই রকেটটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় জেফ বেজোসের মহাকাশ স্বপ্নের পাশাপাশি আমেরিকার চন্দ্রবিজয় মিশনও এখন দীর্ঘস্থায়ী বিলম্বের মুখে পড়ল।
/কহু