ঈদুল আজহা বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের জন্য বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। দেশে বছরে যত কাঁচা চামড়া সংগ্রহ হয়, তার বড় অংশ আসে কুরবানির কয়েক দিনের মধ্যেই।
এই সময় ঘিরে কয়েক হাজার কোটি টাকার একটি মৌসুমি অর্থনীতি গড়ে ওঠে, যার সঙ্গে যুক্ত থাকেন কুরবানিদাতা, মসজিদ-মাদরাসা, এতিমখানা, মৌসুমি ব্যবসায়ী, আড়তদার, ট্যানারি মালিক ও রফতানিকারকরা।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রায় ৯০ লাখ পশু কুরবানি হয়েছে। সরকারও কাঁচা চামড়ার দাম বাড়িয়েছে। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২-৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭-৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিনামূল্যে বিতরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে বাজারের চিত্র ছিল ভিন্ন। ঈদের প্রথম তিন দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি মূল্যের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। অনেক জায়গায় গরুর চামড়া গত বছরের তুলনায় ১৫০-২০০ টাকা কম দামে বিক্রি হয়েছে। খাসির চামড়ার অবস্থা আরও করুণ- কোথাও ৫-১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, আবার কোথাও বিনামূল্যেও দিয়ে দিতে হয়েছে।
সরকারি মূল্য বনাম মাঠের বাস্তবতা : সরকারের হিসাব অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়ার মূল্য ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় চামড়ার মূল্য ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হওয়ার কথা।
কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানান, ট্যানারির কাছ থেকে উচ্চমূল্যের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় তারা ছোট চামড়া ৪০০-৪৫০ টাকা, মাঝারি চামড়া ৫০০-৫৫০ টাকা এবং বড় চামড়া ৬০০-৬৫০ টাকায় কিনতে বাধ্য হয়েছেন। ঢাকার বাইরে অনেক জেলায় বিক্রি না হওয়া চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি দাম বাড়লেও সেই সুবিধা আসলে কারা পাচ্ছে?
খাতসংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা : চামড়া খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করেছে তা লবণযুক্ত চামড়ার জন্য। কিন্তু অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী লবণ ছাড়াই কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে চেয়েছেন। ফলে তারা নির্ধারিত দাম পাননি। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজির কারণেও সাধারণ বিক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ট্যানারি মালিকরা এখনও লবণযুক্ত চামড়া কেনা শুরু করেনি। অথচ অনেক ব্যবসায়ী ঈদের রাতেই লবণবিহীন চামড়া নিয়ে আড়তে চলে আসেন। ফলে তারা প্রত্যাশিত মূল্য পাবেন না, এটাই স্বাভাবিক। তার অভিযোগ, অনেকেই সরকার থেকে পাওয়া লবণ আলাদাভাবে বিক্রি করে দিয়েছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, যেসব মাদরাসা ও এতিমখানা সরাসরি ট্যানারির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তারা প্রতি চামড়ায় ৮০০-৯০০ টাকা পর্যন্ত পেয়েছে।
ক্ষতির মুখে মাদরাসা ও এতিমখানা : বাংলাদেশে কুরবানির চামড়া বহু ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। কওমি ও আলিয়া মাদরাসা, হাফিজিয়া মাদরাসা এবং এতিমখানাগুলো প্রতি বছর চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে তাদের পরিচালনব্যয়ের একটি বড় অংশ মেটায়।
কিন্তু কয়েক বছর ধরে চামড়ার বাজার অস্থিতিশীল থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত অর্থ পাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে একটি ভালো গরুর চামড়া থেকে যে আয় হতো, এখন তার অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছে।
খাসির চামড়া প্রায় মূল্যহীন : এবারের বাজারে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা ছিল খাসির চামড়ার। ক্রেতা সংকটের কারণে অনেক জায়গায় প্রতি চামড়া মাত্র ৫-১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, কোথাও আবার বিনামূল্যেও দিতে হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে খাসির চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়া, প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং রফতানি সংকোচনের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র সংগ্রাহক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
সাভারে চামড়া জমছে, আস্থা ফিরছে না : ঈদের প্রথম দিনেই সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে প্রায় ৮০ হাজার কাঁচা চামড়া পৌঁছেছে। ট্যানারি মালিকদের লক্ষ্য এ বছর ৭৫-৮০ লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা, যার প্রায় ৮০ শতাংশ সরাসরি সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারিগুলো যে দামে চামড়া কিনছে, সেটিই পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে নিচের স্তরের সংগ্রাহকরা বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া কিনছেন। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে যাওয়ায় তাদেরও বেশি মূল্য দেওয়ার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক বাজার কি একমাত্র কারণ : ট্যানারি মালিকরা চীনের বাজারসহ বৈশ্বিক চামড়াবাজারে মূল্যহ্রাস দায়ী করছেন। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সমস্যার বড় অংশ রয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়। কুরবানির সময় অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ চামড়া বাজারে আসে, কিন্তু সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা সেই হারে বাড়েনি। ফলে সরবরাহ হঠাৎ বেড়ে গিয়ে দাম কমে যায়।
লবণ বিতরণ হলেও সংরক্ষণে ঘাটতি : চামড়া নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ সংরক্ষণ সমস্যা। এ বছর সরকার ১৭.৬০ কোটি টাকার লবণ বিতরণ করলেও বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, অনেকেই এখনও সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি জানেন না। কোথাও লবণের ব্যবহার ভুল হচ্ছে, কোথাও সংগ্রহে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে মূল্যবান কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে।
রাস্তায় পড়ে থাকা চামড়া : ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা
ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি না হওয়া শত শত চামড়া সড়কের পাশে ফেলে রাখতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫০০ টাকায় কেনা চামড়া ২০০ টাকাতেও বিক্রি করা যায়নি। অনেক ব্যবসায়ী ৩০০ টাকায় কেনা চামড়া মাত্র ১০০ টাকায় আড়তে বিক্রি করেছেন। এতে পরিবহন খরচও ওঠেনি।
তাদের অভিযোগ, আড়তদারদের সিন্ডিকেট এবং ট্যানারি মালিকদের বকেয়া অর্থের কারণে বাজারে চাহিদা কমে গেছে। পাঁচ বছর আগে যে চামড়া ৮০০-১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে ৩০০-৫০০ টাকায় নেমে এসেছে।
সম্ভাবনা এখনও বিশাল : সব সংকটের পরও চামড়া শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রফতানি খাত। বর্তমানে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও জুতা রফতানি থেকে বছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয় এবং প্রায় ৮-১০ লাখ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত।
সরকার একসময় এ খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু পরিবেশগত মানদণ্ড, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক সনদ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা সেই লক্ষ্য অর্জনে বাধা হয়ে আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সবুর আহমেদের মতে, বৈশ্বিক চামড়া শিল্পের বাজার ৫৬৬.২৩ বিলিয়ন ডলারের হলেও চামড়া উৎপাদনে বাংলাদেশের অংশ ৩.৫ শতাংশ, অথচ অর্থনৈতিক অবদান ০.২ শতাংশেরও কম। তিনি বলেন, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা গেলে এ খাত থেকে ১৬-১৭ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব।
তার মতে, সঠিক ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার অভাব, কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি এবং সাভার চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপির অকার্যকারিতা বাংলাদেশের চামড়াকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে দিচ্ছে না। পাশাপাশি সহজ ব্যাংকঋণ ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, উৎপাদক থেকে ট্যানারি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে প্রতি বছর ঈদুল আজহার পর একই প্রশ্ন ফিরে আসবে- সরকারি দাম বাড়ল কিন্তু মুনাফা গেল কোথায়?
/এসএকে