জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ঐতিহাসিক ৮১তম অধিবেশনের মর্যাদাপূর্ণ সভাপতি নির্বাচিত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, এই ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক অর্জন এবং বিজয় মূলত বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিজয়।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে রাষ্ট্রীয় সফরে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এই মন্তব্য করেন। এর আগে গত ২ জুন জাতিসংঘের সদরদফতরে অনুষ্ঠিত বিশ্বমঞ্চের এক রোমাঞ্চকর নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকৌরিসকে পরাজিত করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।
সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, এই অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য আমি সর্বাগ্রে প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। প্রধানমন্ত্রী যদি এই আন্তর্জাতিক পদের জন্য নির্বাচনে লড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিতেন এবং শুরু থেকেই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে, অবিচলভাবে ও বিরোধহীনভাবে আমাদের পুরো টিমকে সর্বাত্মক সমর্থন না করতেন, তাহলে দীর্ঘ ১০ বছরের এই কঠিন কূটনৈতিক পথ আমরা মাত্র ১০ সপ্তাহে সফলভাবে অতিক্রম করতে পারতাম না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের দূতাবাসে কর্মরত ব্যক্তিরা এই লক্ষ্য অর্জনে দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করেছেন। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টাসহ তারা সবাই মিলে যে চমৎকার ‘টিম স্পিরিট’ নিয়ে কাজ করেছেন, এই বিজয়ের পেছনে তার অবদান ছিল বিপুল ও অবিস্মরণীয়। এই অনন্য আন্তর্জাতিক বিজয়কে তারা যৌথভাবে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কাছে উৎসর্গ করছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের পাশাপাশি বিশ্ব সংস্থার এই শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি কোনো বিশেষ ছুটিতে যাবেন কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, এটা নিয়ে এত ব্যস্ত বা চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আজ থেকে ঠিক ৪০ বছর আগে বাংলাদেশের সাবেক সফল পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং অত্যন্ত সফলভাবে বিশ্বমঞ্চ পরিচালনা করেছিলেন।
খলিলুর রহমান স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি তখন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর একান্ত সচিব বা পিএস ছিলাম এবং তার সঙ্গে অত্যন্ত কাছ থেকে কাজ করেছি। তিনি তৎকালীন সময়ে কোনো ছুটি না নিয়ে দুই পদেই পূর্ণকালীনভাবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন। সেটি ছিল ইন্টারনেট-পূর্ব সম্পূর্ণ অ্যানালগ যুগ, কিন্তু বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে নিরবচ্ছিন্নভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বই একসঙ্গে সমান দক্ষতার সঙ্গে পালন করা শতভাগ সম্ভব এবং এটি এখন বৈশ্বিক কূটনীতিতে খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়।
মতবিনিময়ের একপর্যায়ে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা যখন বলেন যে দেশের মানুষ ও গণমাধ্যম চায় তিনি একাধারে দুটি পদেই বহাল থাকুন, তখন তার জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়টি আমি আগেও দেশবাসীর কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার করেছি। অনেকেই অপপ্রচার বা ভুল তথ্য দিয়ে বলেছেন যে বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের দায়িত্বে যিনি আছেন— জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক, তিনি নাকি সভাপতি পদের জন্য নিজের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন।
আসলে প্রকৃত সত্য বিষয়টি হলো ভিন্ন। তিনি মূলত জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ‘গ্রিন পার্টি’-এর অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন এবং তার দল জার্মানির সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে হেরে যাওয়ায় তিনি স্বাভাবিক নিয়মেই আর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে থাকতে পারেননি, পদত্যাগের কোনো ঘটনা সেখানে ঘটেনি। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া ৮১তম অধিবেশনে বৈশ্বিক এই শক্তিশালী ফোরামের সরাসরি নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ।
সময়ের আলো/টিএইচ