বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জরুরি যোগাযোগের মাধ্যম ‘লাল টেলিফোন’-এর তামার তার চুরির মামলায় গ্রেফতার হওয়া দুই আসামির প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
শুক্রবার (৫ জুন) মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম আজ বিকেলে এই আইনি আদেশের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
আদালতের প্রসিকিউশন শাখা সূত্রে জানা গেছে, রিমান্ডে পাঠানো দুই আসামি হলেন বাংলাদেশ সচিবালয়ের আউটসোর্সিং কর্মী রঞ্জন চন্দ্র এবং ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী রেজাকুল ইসলাম। গত বৃহস্পতিবার ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট বিশেষ অভিযান চালিয়ে শাহবাগ থানা এলাকা থেকে এই দুজনকে গ্রেফতার করে।
আজ শুক্রবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির এসআই ইনজামুল হক আসামিদের আদালতে হাজির করে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানান। আদালতে আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত না থাকায় রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শেষে বিচারক ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
চুরির এই নজিরবিহীন ঘটনাটি ঘটে সদ্য সমাপ্ত কোরবানির ঈদের দীর্ঘ সরকারি ছুটির সময়ে, যা গত ২৫ মে থেকে শুরু হয়েছিল। সাত দিনের দীর্ঘ ছুটি শেষে গত সোমবার সচিবালয় খুললে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দেখতে পান যে প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওই লাল টেলিফোনে কোনো সংযোগ নেই।
বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা এসে কয়েক ঘণ্টার মরিয়া চেষ্টায় সংযোগটি সাময়িকভাবে পুনরুদ্ধার করেন। বিটিসিএলের একজন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানান, এই বিশেষ লাল টেলিফোনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দেশের এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে অত্যন্ত গোপনীয়তায় তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি কথা বলতে পারেন।
এই গুরুতর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনায় বিটিসিএলের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজিদ হায়দার বাদী হয়ে গত সোমবার শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন, যা পরবর্তীতে নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু হয়। জিডির বিবরণে বলা হয়েছে, সচিবালয়ের পুরাতন এক নম্বর ভবন থেকে নতুন এক নম্বর ভবন পর্যন্ত একটি বিশেষ কপার বা তামার কেবল বিস্তৃত ছিল।
এই কেবলের মাধ্যমেই সচিবালয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের লাল টেলিফোন নম্বরসহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব টেলিফোন সংযোগ সচল রাখা হতো। দুর্বৃত্তরা সুকৌশলে ভবনের ছাদে উঠে ওই কপার কেবলটি কেটে নিয়ে যায়, যার ফলে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছিল।
গতকাল বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ঢাকার পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান, সচিবালয়ের ওই ভবন থেকে টেলিফোনের মূল্যবান তার চুরি করে এক ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রি করে দিয়েছিলেন আউটসোর্সিং কর্মী রঞ্জন চন্দ্র।
পরে সিটিটিসির একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশে হল সংলগ্ন একটি ভাঙারি দোকান থেকে ব্যবসায়ী রেজাকুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে চকবাজার থানার হোসেনী দালান রোড এলাকার একটি গোপন ভাঙারি গুদামে অভিযান চালিয়ে চুরি যাওয়া বিপুল পরিমাণ তামার তার উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনার পেছনে আর কোনো বড় ধরনের চক্র বা নাশকতা জড়িত আছে কি না, তা রিমান্ডে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে খতিয়ে দেখছে সিটিটিসি।
সময়ের আলো/টিএইচ