দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বর্তমান সরকার একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতেও প্রভাব ফেলে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দাবি করছে সরকার। এসব বিষয়ে সময়ের আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি রফিক রাফি।
সময়ের আলো : বিএনপি সরকারের ১০০ দিন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
বাণিজ্যমন্ত্রী : সরকারের প্রথম ১০০ দিন ভালো-মন্দ মিলিয়েই কেটেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আমরা বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই, যার অনেকই ছিল বৈশ্বিক। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির পরিবর্তনের কারণে বিশ্ববাণিজ্যে এক ধরনের মন্দাভাব তৈরি হয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ায় হরমুজ প্রণালি ঘিরে জ্বালানি পরিবহনে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
দেশের অভ্যন্তরেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছিল। রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা ছিল আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। আমরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় যে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের চিত্র পেয়েছি, তার অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সঙ্গে ঘোষিত তথ্যের পার্থক্য ছিল। ফলে বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করে বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি থেকে বের করে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার কাজও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের সময় আমাদের সামনে বহু চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে আমরা সেগুলো মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরির কাজ শুরু করেছি।
বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কী করছেন?
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সরলীকরণে অগ্রগতি হয়েছে, যার বাস্তব প্রভাব শিগগিরই দেখা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি চামড়া ও পাট খাতকে বহুমুখী রফতানি খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার সুফল অদূর ভবিষ্যতেই দৃশ্যমান হবে।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে আস্থা ও শৃঙ্খলা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রশাসনে কর্মসংস্কৃতি উন্নয়ন ও জনগণের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম ১০০ দিনে গৃহীত উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আরও কার্যকর, কর্মক্ষম ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিনি যতটা সক্রিয়, মন্ত্রীদের তৎপরতা ততটা দৃশ্যমান নয় এমন সমালোচনা রয়েছে।
আমি এ মন্তব্যের সঙ্গে একমত নই। গণমাধ্যমে সব কাজ দৃশ্যমান না হলেও আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে আন্তরিকভাবে কাজ করছি। দায়িত্ব নেওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যেই রমজান শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পিত সরবরাহ ব্যবস্থাপনার কারণে বাজারে কোনো পণ্যের সংকট হয়নি এবং দ্রব্যমূল্য মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল।
এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিউজিল্যান্ড, হংকং, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১০-১২টি দেশের সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আলোচনা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও আলোচনা শুরুর বিষয়ে আমরা আশাবাদী। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
লোকসানি চা-বাগানগুলোকে লাভজনক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বস্ত্র ও পাট খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ধাপে ছয়টি মিল বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
চীনের একটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ‘বাংলাদেশ-চায়না জুট রিসার্চ সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পাটবীজ উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও পাটপণ্যের বহুমুখীকরণে কাজ করা হবে। পাশাপাশি চামড়া খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগও চলছে।
দেশের চাহিদার মাত্র ১ শতাংশ চিনি বর্তমানে দেশীয় চিনিকল থেকে আসে। আমাদের লক্ষ্য তা ৪০ শতাংশে উন্নীত করা। এ জন্য কয়েকটি চিনিকল আধুনিকায়ন এবং অব্যবহৃত জমিতে শিল্পপার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কাফকো ছাড়া অন্য সার কারখানাগুলো গ্যাস সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারে না। এসব কারখানার জন্য পৃথক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন সার দেশেই উৎপাদন সম্ভব হবে।
দেশে কি চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব?
বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৩০০ এমএমসিএফটি, কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ এমএমসিএফটি। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০ এমএমসিএফটি দেশীয় উৎস থেকে এবং প্রায় ৯০০ এমএমসিএফটি এলএনজি আমদানির মাধ্যমে আসে।
বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা সীমিত। এ কারণে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যদিও তা বাস্তবায়নে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে।
বিগত সরকার দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর পরিবর্তে এলএনজিনির্ভরতা বাড়ালেও কোনো কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলেনি। ফলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় দেশ বড় জ্বালানি সংকটে পড়ে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এখন কৌশলগত জ্বালানি মজুদ (স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ) গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
আপনার মন্ত্রণালয়ের ১০০ দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
আমাদের লক্ষ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানে একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ জন্য তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এফটিএ সম্প্রসারণ এবং ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ করা। বর্তমানে যেসব অনুমোদন পেতে প্রায় এক বছর লাগে, তা ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। আপনার মূল্যায়ন কী?
এটি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান একটি রাষ্ট্রীয় চুক্তি। আমাদের লক্ষ্য হবে এর ইতিবাচক দিকগুলো কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো। কোনো ধারা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হলে চুক্তির বিধান অনুযায়ী সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।
সরকারের কর্মকাণ্ডে দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
এটি একটি রাজনৈতিক সরকার। উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মসূচিতে ইতিবাচকভাবে দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করা হবে। পাশাপাশি সরকারের কার্যক্রম জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজও রাজনৈতিক দল করবে।
বিএনপি যতবার ক্ষমতায় এসেছে, ততবারই সংকটের মুখে পড়েছে এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বিএনপি প্রতিবারই সংকটময় সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের অস্তিত্ব সংকটের সময়ে অর্থনীতিকে সচল ও স্থিতিশীল করেন। ১৯৯১ সালে রাজস্ব সংকটের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া অর্থনীতি পুনর্গঠনে ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করেন।
একইভাবে তারেক রহমান এমন সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। সে লক্ষ্যেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আমার বিশ্বাস, গত ১০০ দিনের কর্মকাণ্ড সরকারের জনগণের প্রতি অঙ্গীকারের প্রমাণ বহন করে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরে দেশ একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী হবে।
বলা হচ্ছে দল ও সরকার একাকার হয়ে গেছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত দলের প্রতিনিধিরাই সরকার পরিচালনা করেন। তবে দল ও সরকারের ভূমিকা আলাদা।
সরকার নীতি বাস্তবায়ন করে, আর দল রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
অনেকের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে তার বাবা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের ছায়া দেখা যায়। আপনি কি একমত?
অবশ্যই। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের কাছে যাওয়া। আমার মনে হয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও সে ধারাই অনুসরণ করছেন। তার জীবনযাপন, কর্মপদ্ধতি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে বিষয়টি প্রতিফলিত হয়।
ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আমার কাছে এ ধরনের নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে কোনো ব্যবসায়ী এমন সমস্যার কথা জানালে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি দেখব।
দেশীয় পণ্যকে বিশ্ববাজারে আরও জনপ্রিয় করতে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
পাট, চামড়া ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের আধুনিকায়নে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। পাট ও চামড়া খাতের উৎপাদনশীলতা, বৈচিত্র্য ও রফতানি বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাভারে বিশ্বমানের গবেষণা ও পরীক্ষাগার স্থাপনের কাজ চলছে।
ই-কমার্স খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী করবেন?
ভবিষ্যতের বাণিজ্যে ই-কমার্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। খাতটি নিয়ে সরকারের কিছু পরিকল্পনা রয়েছে, যা সময়মতো প্রকাশ করা হবে।
আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোন তিনটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন?
বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা ও শুল্ক হ্রাস, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা এবং জ্বালানি সংকট নিরসন এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
দায়িত্ব শেষে মন্ত্রণালয়কে কোথায় দেখতে চাইবেন?
আমি মন্ত্রণালয়গুলোকে আরও শক্তিশালী, কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে দেখতে চাই।
ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।
আপনাকেও ধন্যবাদ।
আরবিএন