সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার, মানব পাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বড় অংশে বাংলাদেশের দিক থেকে কাঁটাতারের কোনো অবকাঠামো না থাকলেও জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন করে কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতেও ধাপে ধাপে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ, মাদক ও অস্ত্র পাচার প্রতিরোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুধু প্রকৌশলগত বিষয় নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, সীমান্তবাসীর জীবনযাত্রা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও গভীরভাবে জড়িত।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে পাঠানো বা ‘পুশইন’ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল ও সংবেদনশীল। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যার বড় অংশই পাহাড়ি, বনাঞ্চলঘেরা ও দুর্গম।
এই সীমান্ত দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাদক, অস্ত্র, চোরাচালান এবং মানব পাচারের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীলতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তায় নতুন চাপ তৈরি করেছে। কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের একটি অবকাঠামো নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি দৃশ্যমান প্রতীকও বটে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়েছে- শুধু শারীরিক অবকাঠামো দিয়ে সীমান্ত অপরাধ কতটা দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সীমান্ত অপরাধের একটি বড় অংশই প্রযুক্তিগত ফাঁকফোকর, দুর্নীতি এবং নজরদারির ঘাটতির সুযোগ নিয়ে সংঘটিত হয়।
আন্তর্জাতিক আইনে সীমান্তে স্থাপনা নির্মাণ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো একক বিধান নেই। সাধারণভাবে প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্র তার সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও প্রচলিত রীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষা সক্ষমতাসম্পন্ন স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।
ভারত অংশে কাঁটাতারের বেড়া কীভাবে কাজ করে তা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুই হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এর মধ্যে ১ হাজার ৬৫৩ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। তবে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে ৫৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত কাঁটাতার দেওয়া বাকি রয়েছে।
ভারত আর বাংলাদেশের সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ভারতের অভ্যন্তরে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় বিএসএফ তাদের কার্যক্রম যেমন- তল্লাশি, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে রেইড ইত্যাদি চালাতে পারত। তবে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশে সেই পরিধি বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করা হয়। এর আগে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও পাঞ্জাবে ওই পরিধি থাকলেও গুজরাট আর রাজস্থানে তা যথাক্রমে ছিল ৮০ ও ৫০ কিলোমিটার।
২০২১ সালের নির্দেশ অনুযায়ী, সব সীমান্তেই ৫০ কিলোমিটারের পরিধি করা হয়। ১৯৭৪ সালের চুক্তি মেনে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে দেড়শ গজ পর্যন্ত কোনো নির্মাণকাজ চালানো যায় না। তবে শূন্যরেখা ও কাঁটাতারের বেড়ার মাঝের যে অংশ, সেই ভারতীয় ভূখণ্ডের জমির মালিকরা নিজেদের খেতে চাষাবাদ করতে পারেন। এর জন্য কাঁটাতারের বেড়ায় লোহার গেট আছে। সকালে ওই গেট খোলা হয়, বিএসএফ সদস্যদের রেজিস্টারে নাম লিখিয়ে, পরিচয়পত্র দেখিয়ে চাষের খেতে ঢুকতে পারেন কৃষকরা। আবার সন্ধ্যায় গেট বন্ধ হওয়ার আগে ফিরে আসতে হয় তাদের। ফেরার সময়ে তাদের তল্লাশি করা হয়।
সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গভীর প্রভাব ফেলে। কৃষিজমিতে প্রবেশের সময়সীমা, পরিচয় যাচাই, গেট ব্যবহারের নিয়ম এবং নিরাপত্তা তল্লাশির কারণে অনেক সময় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা বা পারিবারিক সংকটের সময় সীমান্ত পারাপারে জটিলতা তৈরি হলে মানবিক সংকট দেখা দেয়, যদিও কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে গেট খোলার সুযোগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ এখন সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে শুধু কাঁটাতারের ওপর নির্ভরশীল না রেখে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, দুর্গম সীমান্ত এলাকায় বর্ডার আউট পোস্ট (বিওপি) ও টেম্পোরারি অপারেটিং বেস (টিওবি) নির্মাণের পাশাপাশি স্মার্ট বর্ডার সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের সীমান্ত নিরাপত্তায় ড্রোন, থার্মাল ক্যামেরা, সেন্সর, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, যা শারীরিক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত এবং আরাকান আর্মির তৎপরতা বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই পরিস্থিতি নিরাপত্তা কৌশলগতভাবে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর মনে করেন, সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাঁটাতারের বেড়া কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশই সীমান্ত নিরাপত্তায় শারীরিক বাধা ও প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার সীমান্তে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ এবং পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর মনে করেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সীমান্ত নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তার মতে, পুশইন, মাদক ও মানব পাচার মোকাবিলায় কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি কাঁটাতারের বেড়া কৌশলগতভাবে প্রয়োজনীয় হতে পারে, কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী মিত্রতার ধারণা সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, সীমান্ত নিরাপত্তা এখন আর শুধু শারীরিক অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কাঁটাতারের বেড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও এর পাশাপাশি প্রযুক্তি, কূটনীতি, মানবিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার সমন্বয় ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই সমন্বিত ও আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দিকেই অগ্রসর হচ্ছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও