দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং সাম্প্রতিক নীতিগত দুর্বলতার প্রভাবে দেশের বেসরকারি খাতের কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। শিল্পে ঋণের চাহিদা কমেছে, বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়েছে, কমেছে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানও। ফলে বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে আবাসন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও খাত-সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, আবাসন খাতের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ির পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই শতাধিক সংযুক্ত শিল্প খাতে সঞ্চালিত হয়। বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূলধনের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি সৃষ্টিতে এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখা এই খাতের সংকট আরও গভীর হলে সামগ্রিক অর্থনীতিও বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তবে বর্তমানে নিবন্ধন ব্যয় ১৩ শতাংশের বেশি হওয়ায় ফ্ল্যাট ও জমি কেনাবেচা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে আবাসন খাতে নিবন্ধন ব্যয় সর্বোচ্চ। নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিলেও তা এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে প্রায় সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে।
আগের তুলনায় ফ্ল্যাট নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের সুবিধা না থাকায় মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ আবাসন বাজারের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ ছাড়া গত আড়াই বছরে তিনটি সরকারের পরিবর্তন এবং নীতিগত অস্থিরতায় ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভীতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত, যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ আবাসন খাত। এ খাত মন্দায় আক্রান্ত হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও থমকে যেতে বাধ্য। তাই দেশীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা সরকারের দায়িত্ব।
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক খাতের টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেও আবাসন খাতকে চাঙ্গা করে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের সুযোগ ছিল। কিন্তু বিনিয়োগের অন্যতম বড় ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও সরকারি উদাসীনতা ও নীতিগত ভুলের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং রাজউকের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও জটিলতায় ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। জমির অস্বাভাবিক দাম, নির্মাণসামগ্রীর উচ্চমূল্য, ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে আবাসন খাত প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে ফ্ল্যাটের দাম মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতের জন্য কোনো আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ নেই। বরং নির্মাণসামগ্রীর ওপর নতুন কর ও শুল্ক আরোপের ফলে নির্মাণ ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনলে প্রকৃত লেনদেন বাড়বে, বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু এবারের বাজেটে সে ধরনের উদ্যোগের প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভ্যাট, শুল্ক ও কর বৃদ্ধির ফলে দেশের ইস্পাত শিল্প বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এলিভেটর, এস্কেলেটর অ্যান্ড লিফট ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শফিউল আলম উজ্জল বলেন, বর্তমান নগরায়ণ, বহুতল ভবন নির্মাণ ও শিল্পায়নের বাস্তবতায় লিফট কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য মূলধনী যন্ত্রপাতি।
কিন্তু ২০২৩ সালে লিফটকে মূলধনী যন্ত্রপাতির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তী দুই অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে শুল্ক বাড়ানোয় লিফট আমদানির মোট শুল্কহার প্রায় ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬ শতাংশে পৌঁছেছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমান বিনিয়োগ মন্দার মধ্যে আবাসন খাতে ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করা গেলে অর্থ পাচার কমার পাশাপাশি দেশে বিনিয়োগও বাড়ত।
বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ না থাকায় দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে, আর দেশের আবাসন ব্যবসায়ীদের অনেকেই টিকে থাকার লড়াই করছেন। তাদের মতে, পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে সরকারকে আবাসন খাতের সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। গৃহঋণ সহজীকরণ, নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস, কর ও শুল্ক কাঠামো যৌক্তিককরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার সম্ভব হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও