নিয়ম মেনে ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে পারছে না দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ। ফলে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও বহুজাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা আটকে পড়েছে গ্রুপটির কাছে। এসব ঋণ খেলাপি হওয়ার উপক্রম হলেও ব্যাংকগুলো চূড়ান্ত কোনো পদক্ষেপে না গিয়ে অপেক্ষা করছে নতুন সমাধানের।
উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে জরুরি বৈঠকে বসেন অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রতিনিধিরা। ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনসহ শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকাররা এই সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভা সূত্র জানায়, দীর্ঘ আলোচনার পরও ব্যাংকগুলো এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংকগুলোকে নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য, গ্রুপটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখা এবং প্রয়োজনে কিছু কারখানা বিক্রি করে ঋণ সমন্বয়। পাশাপাশি গ্রুপটিতে ব্যাংকের প্রতিনিধি বসিয়ে নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করা। ঋণের মান ঠিক রাখতে মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে যেকোনো উপায়ে গ্রুপটিকে সচল রাখার নির্দেশনা এসেছে। তবে সিটি গ্রুপ সংকটের যে কারণ ব্যাখ্যা করছে, তার সবকিছু গ্রহণযোগ্য নয়। ডলারের দাম যখন বেড়েছিল, তখন পণ্যের দামও বাড়ায় সিটি গ্রুপ। আবার যে পরিমাণ চলতি মূলধন ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে, তার সমপরিমাণ পণ্য তাদের গুদামে নেই।
এরপরও গ্রুপটিকে নিবিড় তদারকির মধ্যে রেখে সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সব ধরনের আর্থিক লেনদেনে ব্যাংকের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে, যাতে কোনো অব্যবস্থাপনা না হয়ে সরাসরি ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যবহৃত হয়।
২০২৩ সালে সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মারা যাওয়ার পর থেকে গ্রুপটি পরিচালনা করছেন তার ছেলে ও বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. হাসান।
গত মে মাসে বৈদেশিক মুদ্রার লোকসান, ব্যাংক খাতের সংকটে চলতি মূলধনের ঘাটতি এবং গ্যাস সংযোগে বিলম্বের কারণে তাদের ছয়টি বড় প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে। এসব কারণ উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতিগত সহায়তা চেয়েছিল সিটি গ্রুপ। এরপর গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গ্রুপটিকে সচল রাখতে একটি কার্যকর সমাধান বের করার নির্দেশনা দেন ব্যাংকগুলোকে। তবে ঋণের কিস্তির টাকা নিয়মিত না পাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন তারল্য সংকটে পড়েছে।
জানা যায়, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত সিটি গ্রুপের ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের পরিমাণ ২৪ হাজার ১৮৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে এইচএসবিসি ব্যাংক ২ হাজার ২৫৫ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ২ হাজার ৫১ কোটি, সিটি ব্যাংক পিএলসি ১ হাজার ৪৪০ কোটি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ১ হাজার ১৬৭ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক ১ হাজার ১৫৮ কোটি, পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ১৪৫ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১ হাজার ৭৮ কোটি, প্রাইম ব্যাংক ১ হাজার ৪৭ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংক ৯৮৬ কোটি এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংক ৯৮৪ কোটি টাকা পায়।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সিটি গ্রুপের ঋণগুলো এখনও খেলাপি করা হয়নি। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত শিল্পগোষ্ঠীটির বার্ষিক আয় প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং এখানে প্রায় ২৫ হাজার কর্মী কাজ করছেন। দেশের অন্যতম শীর্ষ গ্রুপটি হঠাৎ করে ধসে পড়ুক— তা ব্যাংকার বা অর্থনীতিবিদ কেউ চাচ্ছেন না। তাই ঋণ পুনর্গঠন করে এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে গ্রুপটিকে বাঁচিয়ে রাখার পথ খুঁজছে ব্যাংক খাত।
সময়ের আলো/আআ