নিজস্ব জমিতে একটি স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণ শুধু ইট-পাথরের গাঁথুনি বা নিছক কাঠামো নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে সরকারের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া, নানাবিধ আইনি বাধ্যবাধকতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা ও পরিবেশের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো।
অনেকেই না জেনে বা অসচেতনতাবশত নিজের পুরো জমি জুড়ে ভবন নির্মাণ করে বসেন। অথচ বাড়ি তৈরির সময় চারপাশের সীমানা থেকে আইন অনুযায়ী ঠিক কতটুকু জায়গা ছেড়ে দিতে হয় এবং এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হতে পারে— সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক।
যে-কোনো জমিতে নির্মাণকাজ শুরু করার প্রধান এবং অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা ও আইনি অবস্থা পুরোপুরি খতিয়ে দেখা। জমির মূল দলিল, খতিয়ান, নামজারি বা মিউটেশন এবং হালনাগাদ খাজনা দাখিলা একদম নির্ভুল ও আইনিভাবে নিষ্কণ্টক রয়েছে কি না, তা শুরুতেই নিশ্চিত করতে হবে। কাগজপত্র শতভাগ ঠিক থাকার পর ভবনের নকশা অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি আসে।
যে-কোনো ভবনের নকশা তৈরির ক্ষেত্রে একজন অনুমোদিত স্থপতি বা প্রকৌশলীর কারিগরি সহায়তা নেওয়া বাধ্যতামূলক। কারণ একটি আদর্শ নকশায় ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ বা বিএনবিসি ২০২০-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ভবনের নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল, সুপরিকল্পিত বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, অগ্নি প্রতিরোধ সক্ষমতা এবং সর্বোপরি ভূমিকম্প সহনশীলতার নিয়মগুলো যথাযথভাবে সন্নিবেশিত করতে হয়। এর পাশাপাশি পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ড্রেনেজ ও সেপটিক ট্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও আগে থেকেই চূড়ান্ত করা জরুরি।
শহর ও গ্রামাঞ্চলে বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া বা নিয়মের কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। রাজধানী ঢাকাতে রাজউক, চট্টগ্রামে সিডিএ, রাজশাহীতে আরডিএ-এর মতো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কিংবা অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরাঞ্চলে সংশ্লিষ্ট পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনগুলো বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়ে থাকে।
শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সেটব্যাক বা জায়গা ছাড়া, ওপেন স্পেস রাখা, রাস্তার প্রশস্ততা অনুযায়ী ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা বিধান রক্ষা করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলে বাড়িঘর নির্মাণের জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের আনুষ্ঠানিক অনুমতি নেওয়ার বিধান রয়েছে। সেখানেও ন্যূনতম খোলা জায়গা রাখা, প্রতিবেশীর জমিতে অনধিকার প্রবেশ না করা এবং পানি ও নিকাশ ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিকল্পনা করা আবশ্যক।
তবে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এই নিয়মগুলোর প্রশাসনিক তদারকি কিছুটা কম দেখা যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শহরে এই ধরনের নিয়ম ভাঙলে মোটা অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা বা নকশা বহির্ভূত বর্ধিত অংশ ভেঙে ফেলার মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
বাড়ি করার সময় চারপাশের কতটুকু জায়গা ছাড়তে হবে, সে বিষয়ে আইন অত্যন্ত স্পষ্ট। বিএনবিসি ২০২০-এর বিধিমালা অনুযায়ী, বাড়ি নির্মাণের সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা বা কারিগরি ভাষায় ‘সেটব্যাক’ রাখা আইনত বাধ্যতামূলক। সাধারণ নিয়ম অনুসারে, সামনের মূল রাস্তার দিকে ৫ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত জায়গা ফাঁকা রাখতে হয়।
এ ছাড়া ভবনের পেছনের অংশে ৪ থেকে ৬ ফুট এবং দুই পাশে ৩ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত খোলা জায়গা রাখতে হবে। বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে এই দূরত্বের পরিমাপ জমির আকার ও সামনের রাস্তার প্রশস্ততার ওপর ভিত্তি করে আরও অনেক বেশি হতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী, আলো-বাতাস ও অগ্নি নিরাপত্তার স্বার্থে মোট প্লটের অন্তত ৩০ শতাংশ জায়গা উন্মুক্ত বা ফাঁকা রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
নির্ধারিত জায়গা না ছেড়ে বা অনুমোদনহীনভাবে বাড়ি নির্মাণ করলে তা আইনের দৃষ্টিতে ‘অবৈধ নির্মাণ’ হিসেবে গণ্য হয়। এই ভুলের কারণে রাজউক, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন যে-কোনো সময় ভবনটির অবৈধভাবে বর্ধিত অংশ উচ্ছেদ বা ভেঙে দিতে পারে। এমনকি ভবন মালিকের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলা, ভারী জরিমানা বা ভবনের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
এর বাইরেও, প্রতিবেশীর সীমানা গ্রাস করলে বা তার আলো-বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিবেশী দেশের প্রচলিত আদালতে দেওয়ানি মামলা করতে পারেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে চারপাশে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা না থাকলে ফায়ার সার্ভিস বা উদ্ধারকারী দলের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা মানুষের জীবনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই জায়গা ছেড়ে আইন মেনে নির্মাণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ, স্থায়ী ও ঝামেলামুক্ত উপায়।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, অনুমোদন ছাড়া বা নকশা লঙ্ঘন করে বাড়ি করলে তা পরবর্তীতে বৈধ করা যায় কি না। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণের পর নির্দিষ্ট জরিমানা বা ফি দিয়ে এবং অনুমোদিত স্থপতি বা প্রকৌশলীর মাধ্যমে সংশোধিত নকশা জমা দিয়ে ‘রেগুলারাইজেশন’ প্রক্রিয়ায় তা বৈধ করা সম্ভব, তবে এই সুযোগ অত্যন্ত সীমিত পরিসরে দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো ভবন যদি সরকারি খাস জমিতে, রাস্তার ওপর কিংবা চারপাশের বাধ্যতামূলক সেটব্যাকের জায়গা পুরোপুরি গ্রাস করে তৈরি করা হয়, তবে তা কোনো অবস্থাতেই রেগুলারাইজ বা বৈধ করা যায় না; বরং প্রশাসন তা ভেঙে দিতে বাধ্য।
একইভাবে ভবনের উচ্চতা বা তলা সংখ্যারও একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, যা মূলত এলাকার ধরন, সামনের রাস্তার প্রস্থ ও জমির আকার অনুসারে নির্ধারিত হয়। একে কারিগরি ভাষায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা ‘এফএআর’ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, অত্যন্ত সরু রাস্তার পাশে সাধারণত চারতলার বেশি ভবনের অনুমোদন মেলে না, যেখানে প্রশস্ত রাস্তার পাশে বা বাণিজ্যিক জোনে ১০ তলা বা তারও বেশি তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে।
একটি আধুনিক ভবনে পানি ও নিকাশ ব্যবস্থার পাশাপাশি পরিবেশগত ও শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোতেও স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নগর বা শহর এলাকায় প্রতিটি ভবনে নিজস্ব সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক এবং তা শহরের মূল ড্রেনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হয়।
এই নিয়ম না মানলে পরিবেশ অধিদপ্তর বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভবনের অনুমতি বাতিল করতে পারে। এ ছাড়া নির্মাণকাজের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষায় সেফটি হেলমেট, বুট জুতা ও সেফটি বেল্টের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবনে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও জরুরি ফায়ার এক্সিট সিঁড়ি রাখতে হবে। কাজের সময় রাস্তা অবরুদ্ধ করে বা নির্মাণ সামগ্রী রেখে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলে শ্রম আইন ও বিল্ডিং কোড অনুযায়ী শাস্তি হতে পারে।
বর্তমানে বিএনবিসি ও পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশবান্ধব বা টেকসই গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করছে। বাড়ির নকশায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশের সুবিধা, ছাদবাগান, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং এবং সোলার প্যানেল যুক্ত করলে তা যেমন পরিবেশ রক্ষা করে, তেমনই দীর্ঘমেয়াদে ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির বিল উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনে।
সময়ের আলো/জেডি