প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও চীন একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করার পাশাপাশি বাণিজ্য, অবকাঠামো, যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা, বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ব্রিকসে বাংলাদেশের সদস্যপদের আকাঙ্ক্ষা এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অংশীদার হওয়ার প্রচেষ্টায়ও বেইজিং সমর্থন জানিয়েছে। এছাড়া দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে নিয়মিত কৌশলগত সংলাপ চালু এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে নতুন ‘২+২’ সংলাপ ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও নীতিগত সম্মতি হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ ও চীন পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা আরও জোরদার করতে এবং উচ্চপর্যায়ের সফর ও যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে একমত হয়েছে। বাংলাদেশ ‘এক-চীন’ নীতির প্রতি পুনরায় সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও উন্নয়নযাত্রার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
দুই দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি শতভাগ শুল্ক লাইনে শূন্য-শুল্ক সুবিধা অব্যাহত রাখা, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো, মোংলা বন্দর উন্নয়ন এবং চট্টগ্রামের চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, সৌর প্রযুক্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় যৌথ সহযোগিতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বাড়ানোর নতুন পথ অনুসন্ধানে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদী খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি-সম্পর্কিত প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা জোরদারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা যাচাই দ্রুত শেষ করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে সামরিক প্রতিনিধি বিনিময়, প্রশিক্ষণ এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে।
মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে শিক্ষা, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, ক্রীড়া, যুব উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে বেইজিং।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। পাশাপাশি ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং এসসিওর অংশীদার হওয়ার আবেদনেও বেইজিং আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে চীন।
সফরকালে উন্নয়ন সহযোগিতা, কৃষি, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সফরের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের সরকার ও জনগণের আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ