আর্জেন্টিনার জাতীয় খেলা ফুটবল নয়, তাহলে কী?

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

আর্জেন্টিনা নাম শুনলেই ম্যারাডোনার সেই জাদুকরী ড্রিবলিং কিংবা লিওনেল মেসির অতিমানবীয় ফুটবল শৈলী। স্বাভাবিকভাবে তাদের দেশের জাতীয় খেলা হবে ফুটবল।

2026-06-26T23:14:09+00:00
2026-06-26T23:14:09+00:00
 
  রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
২ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
খেলা
আর্জেন্টিনার জাতীয় খেলা ফুটবল নয়, তাহলে কী?
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১১:১৪ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
আর্জেন্টিনা নাম শুনলেই ম্যারাডোনার সেই জাদুকরী ড্রিবলিং কিংবা লিওনেল মেসির অতিমানবীয় ফুটবল শৈলী। স্বাভাবিকভাবে তাদের দেশের জাতীয় খেলা হবে ফুটবল। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে চোখ কপালে ওঠার মত অবস্থা। 

ফুটবলের দেশ বললেই সবার আগে যে দুটি দেশের নাম আমাদের মনে আসে, তার একটি আর্জেন্টিনা, অন্যটি ব্রাজিল। মজার বিষয় হলো, ফুটবল জনপ্রিয় হলেও এই দুটি দেশের কোনোটিরই জাতীয় খেলা ফুটবল নয়। আর্জেন্টিনার সরকারি জাতীয় খেলার নাম পাতো (Pato)। ঘোড়ার পিঠে চড়ে এ খেলা খেলতে হয়। এটি এমনই এক রোমাঞ্চকর খেলা, যেখানে মিশে আছে পোলো, বাস্কেটবল ও রাগবির উপাদান—এমনটাই মনে করেন গবেষকেরা।

স্প্যানিশ ভাষায় ‘পাতো’ শব্দের অর্থ হাঁস। এই নামের পেছনেও রয়েছে এক অদ্ভুত ইতিহাস। সে ইতিহাস আবার কয়েক শ বছর ধরে আর্জেন্টিনার গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।

চারশো বছরের পুরোনো খেলা পাতো
‘কাউবয়’ বললে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে মাথায় হ্যাট, পরনে মোটা কাপড়ের প্যান্ট আর কোমরের বেল্টে বন্দুক গুঁজে ঘুরে বেড়ানো ঘোড়সওয়ার রাখালদের কথা মনে হয়। তেমন ঘোড়সওয়ার রাখাল কিন্তু আর্জেন্টিনাতেও ছিল। তাদের বলা হতো গাউচো। এই গাউচোরা ছিল মূলত আর্জেন্টিনায় উপনিবেশ তৈরি করা স্প্যানিশ ও স্থানীয় আদিবাসী মিশ্র বংশোদ্ভূত যাযাবর শ্রেণির মানুষ। তারা মধ্য আর্জেন্টিনাজুড়ে আটলান্টিক উপকূল থেকে আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল পাম্পাস বা তৃণভূমি এলাকায় বসবাস করত। তাদের কাজ ছিল মূলত সেই উন্মুক্ত তৃণভূমিতে বুনো গবাদিপশু শিকার করা। তারা প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে জীবনধারণ করত।

গাউচোরা দীর্ঘ সময় ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য বোম্বাচাস নামে ঢিলেঢালা ট্রাউজার্স, পনচো এবং সুরক্ষার জন্য ফাকন নামে একধরনের লম্বা ছুরি ব্যবহার করত। তাদের অবসর বিনোদন বলতে ছিল গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া, কবিতা আবৃত্তি এবং পাতো নামে সেই ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার খেলা।

পাতো নামের এই খেলার উৎপত্তি ১৭ শতকে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত আর্জেন্টিনায় প্রথম দিকের বসতি স্থাপনকারী ইউরোপীয়দের নিয়ে আসা বল খেলার সঙ্গে গাউচোদের ঘোড়া চালানোর দক্ষতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল এ খেলা। স্প্যানিশ ভাষায় পাতো শব্দের অর্থ ‘হাঁস’। এ খেলার প্রথম দিকে একটি জীবিত বা সদ্য মৃত হাঁস চামড়ার ব্যাগে ভরে খেলোয়াড়েরা ঘোড়ায় চড়ে একে অপরের কাছ থেকে হাঁস ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। এতে প্রায়ই গুরুতর আহত হওয়া, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটত। যে দল হাঁসটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারত, তারাই জয়ী হতো। হাঁস ব্যবহারের কারণেই খেলার নাম হয়ে যায় পাতো।

বিশ শতকের ত্রিশের দশকে পাতোকে আধুনিক ও নিয়ন্ত্রিত খেলায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৩৭-৩৮ সালের দিকে প্রথম আনুষ্ঠানিক নিয়মকানুন তৈরি হয়। হাঁসের পরিবর্তে ব্যবহার শুরু হয় চামড়ার তৈরি বিশেষ বল, যাতে ছয়টি হাতল লাগানো থাকে। পরবর্তী সময়ে খেলাটি হর্সবল নামেও পরিচিতি পায়।


এই পরিবর্তনের ফলে খেলাটি নিরাপদ হয় এবং ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত খেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৪১ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত হয় এর প্রথম জাতীয় প্রতিযোগিতা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আর্জেন্টাইন পাতো ফেডারেশন। এ প্রতিষ্ঠান খেলাটির নিয়ন্ত্রণ ও প্রসারের দায়িত্ব পালন করে। ১৯৫৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জুয়ান ডোমিঙ্গো পেরন পাতোকে আর্জেন্টিনার জাতীয় খেলা ঘোষণা করেন। পরে ২০১৭ সালে আইনগতভাবেও এর মর্যাদা পুনরায় নিশ্চিত করা হয়। আদিবাসী জ্ঞান এবং ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত এই খেলা দেশটির ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে টিকে রয়েছে।

খেলার নিয়ম ও কৌশল
এ খেলায় প্রতি দলে ৪ জন করে মোট দুটি দল অংশ নেয়। ঘোড়া, ৬টি চামড়ার হাতলযুক্ত একটি বল এবং মাঠের দুই প্রান্তে নেটসহ দুটি খাড়া রিং বা ঝুড়ি থাকে। খেলোয়াড়দের এক হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে রাখতে হয় এবং গোল করার আগে অন্তত তিনবার নিজেদের মধ্যে বল পাস করতে হবে।

আজকের পাতো
বর্তমানে পাতো মূলত আর্জেন্টিনার গ্রামীণ অঞ্চলে বেশি জনপ্রিয়। বিভিন্ন প্রাদেশিক টুর্নামেন্ট ও জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয় নিয়মিত। রাজধানীতে বড় প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশের সেরা অশ্বারোহীরা অংশ নেন।

আজ বিশ্বকাপ ফুটবলের বিলিয়ন ডলারের আয়োজনের দিনেও যখন ঘোড়ার পিঠে চেপে খেলোয়াড়েরা ছুটে চলেন, হাতে ধরা থাকে ছয় হাতলওয়ালা বল; তখন মনে হয়, পাতো শুধু একটি খেলা নয়, এটি আর্জেন্টিনার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের এক চলমান প্রতীক। মেসি ও তাঁর দলও নিশ্চয়ই গর্ব করেন ইতিহাস আর সংস্কৃতি ধরে রাখা সেসব খেলোয়াড়ের জন্য।

সময়ের আলো/আআ
  বিষয়:   আর্জেন্টিনা  জাতীয় খেলা  ফুটবল  ক্রীড়া 


Advertisement
Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: