মহিপুর-আলীপুরে অবৈধ ট্রলিংয়ের বিস্তার, প্রশ্নের মুখে প্রশাসন

কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

সারাদেশ

সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও আইন অমান্য করে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর, আলীপুর, কুয়াকাটা ও আশাখালী মৎস্য বন্দর সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে অবাধে চলছে

2026-06-29T02:00:41+00:00
2026-06-29T13:14:25+00:00
 
  বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬,
৪ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
মহিপুর-আলীপুরে অবৈধ ট্রলিংয়ের বিস্তার, প্রশ্নের মুখে প্রশাসন
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ২:০০ এএম  আপডেট: ২৯.০৬.২০২৬ ১:১৪ পিএম
আর্টিসানাল ট্রলিং বোট। ছবি : সময়ের আলো
সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও আইন অমান্য করে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর, আলীপুর, কুয়াকাটা ও আশাখালী মৎস্য বন্দর সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে অবাধে চলছে অবৈধ ও রূপান্তরিত ‘আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের’ তাণ্ডব। নিষিদ্ধ অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছের পোনা, রেণু, ডিমওয়ালা মা মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির পোনা এবং সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য ধ্বংস করায় সমুদ্রের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় জীবিকা সংকটে পড়েছেন উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার প্রান্তিক জেলে।

স্থানীয় জেলে ও মৎস্য সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মহিপুর-আলীপুর অঞ্চলে গত বছর প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট সক্রিয় ছিল। চলতি বছরে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কাঠের ট্রলারকে অবৈধভাবে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে। দ্রুত অধিক মুনাফার আশায় একটি সাধারণ ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী এসব বড় ট্রলিং বোটের গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা উপকূলীয় অগভীর জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ শিকার করছে। স্থানীয় মৎস্যজীবীরা জানান, অনেক সময় এসব বোট উপকূল থেকে কয়েক নটিক্যাল মাইলের মধ্যেই জাল ফেলে। ফলে উপকূলীয় প্রজনন ক্ষেত্র ও মাছের অভয়াশ্রমগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রলিং বোটে ব্যবহৃত ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে ঘষে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং বিভিন্ন অণুজীবের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে দেয়। এতে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

এছাড়া এসব ট্রলিং বোটে ফিস ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার, উইঞ্চ মেশিনসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে মাছের ঝাঁক সহজেই শনাক্ত করে ব্যাপক হারে আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ছোট নৌকা ও সাধারণ ট্রলারনির্ভর জেলেরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।

মহিপুর ও আলীপুর বন্দরের সাধারণ জেলেরা অভিযোগ করে বলেন, বড় ট্রলিং বোটগুলো প্রায়ই তাদের জালের ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে লাখ লাখ টাকার জাল ছিঁড়ে যায় এবং ক্ষতির মুখে পড়েন ক্ষুদ্র জেলেরা। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করলে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটে।

মহিপুরের জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা দিনের পর দিন সমুদ্রে গিয়ে মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে আসি। অথচ কিছু প্রভাবশালী ট্রলার মালিক অবৈধ ট্রলিংয়ের মাধ্যমে সাগরের মাছ ও পোনা নিধন করছে। প্রশাসন চাইলে একদিনেই এসব বন্ধ করতে পারে।

জেলে আবুল কাশেম বলেন, ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। লাখ লাখ রেণু প্রতিদিন নিধন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে জেলেদের মাছ ধরার মতো কিছুই থাকবে না।

মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্র দূষণ এবং অবৈধ ট্রলিং—এই তিনটি কারণে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ বর্তমানে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে ডিমওয়ালা মা মাছ ও পোনা নিধনের ফলে মাছের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে শুধু ইলিশ নয়, লাক্ষা, পোয়া, রূপচাঁদা, চিংড়িসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, রফতানি আয় এবং নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাও হুমকির মুখে পড়বে।

জেলেদের অভিযোগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং নৌ পুলিশের একটি অংশের পরোক্ষ সুবিধার কারণেই বছরের পর বছর এসব অবৈধ ট্রলার প্রকাশ্যে সাগরে মাছ শিকার করছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মহিপুর মৎস্য আড়ৎ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা বলেন, অবৈধ ট্রলিং বন্ধে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে কিন্তু এতে তেমন কোনো ফল হয়নি। বরঞ্চ আগের তুলনায় দিন দিন বাড়ছে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি না থাকলে এটি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনায় নেই।

এ বিষয়ে ফিশারিজ কর্মকর্তা বখতিয়ার আহমেদ বলেন, অবৈধ জালের কারণে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা নিধন হচ্ছে। ফলে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও লাখো মানুষের জীবিকা রক্ষায় অবৈধ জাল বন্ধ এবং কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।

কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান বলেন, ট্রলিং বোট নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। আমরা অবৈধ মৎস্য শিকার ও নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে তৎপর রয়েছি। তবে গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ট্রলিং বোটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, জনপ্রতিনিধি ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, অবৈধ ট্রলিং বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় মৎস্যসম্পদ ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বড় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   মহিপুর  আলীপুর  অবৈধ ট্রলিং  প্রশাসন  কুয়াকাটা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: