জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দুই দলকেই একে অন্যকে সম্মান ও যৌক্তিক কারণে সহযোগিতা করার মানসিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। দেশের স্বার্থে তিনি সরকারি দলের প্রতি ‘একটি ওয়ান্ডারফুল কম্বিনেশন’ নিয়ে চলার তাগিদ দিয়ে বলেন, বিরোধী দলকে দুর্বল করার চেষ্টা না করে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অতীতের সংসদীয় ব্যাড কালচার, ব্যক্তিপূজা ও চরিত্রহননের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সোমবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। বিরোধীদলীয় নেতা এদিন প্রায় ৫০ মিনিট বক্তব্য রাখেন।
জাতীয় সংসদকে সরকারি ও বিরোধী দল এ দুই ‘টায়ারের’ ওপর চলা একটি যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করে শফিকুর রহমান বলেন, এই সংসদেরও দুটি টায়ার। একটি সরকারি দল, আরেকটি বিরোধী দল। যেকোনো একটি টায়ার অকেজো হয়ে গেলে যান চলবে না। এক টায়ারে আপনি পিন লাগাবেন, পেরেক মারবেন, তা হলে কিন্তু ওই টায়ারটি ফুটো হয়ে যাবে। ওইটা ফুটো হয়ে গেলে ওই টায়ার চলবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, একটা চমৎকার টেনডেন্সি লক্ষ করেছি, সরকারি দলের প্রায় সব বক্তা বিরোধী দলের বক্তব্য কুচি কুচি করে কাটার পরে বলেন, এগুলো ছাড়েন। আসেন ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা দেশটি চালাই। ওই কুচি কুচি করার যন্ত্রটা আসুন আমরা ফেলে দিই। আমরা একটি বিউটিফুল, ওয়ান্ডারফুল কম্বিনেশন নিয়ে চলি। এর অর্থ এটি নয় যে সরকারি দলের যেটি অভিপ্রায়, বুঝে না বুঝে সেটিই হবে বিরোধী দলের অভিপ্রায়। আবার এর অর্থ এটিও নয় যে সরকারি দল সংগত কোনো বিষয় নিয়ে সামনে এগোলে বিরোধী দল বিরোধিতার খাতিরে শুধু বিরোধিতাই করে যাবে এই দুটির কোনোটাই না। সরকারি দলও বিরোধী দলকে সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হবে, আর বিরোধী দলেরও সংগত সব ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে।
বক্তব্যের শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা ‘গভীর শ্রদ্ধা’র সঙ্গে স্মরণ করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জেনারেল এম এ জি ওসমানী, আ স ম আবদুর রবসহ সব শহিদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের। নব্বইয়ের গণআন্দোলন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের শহিদ, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শহিদদেরও স্মরণ করেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, আমরা একটি কষ্টে ভোগা দল। এক-দুই করে ১১ জনকে আমাদের বুক থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ সময় বাঁ দিকের আসনে উপবিষ্ট জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলামকে দেখিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ১২ নম্বর জন এখানে জীবিত আছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাজেট বড় না ছোট, বাস্তবায়নযোগ্য বা এর সংখ্যাতাত্ত্বিক অনেক বিশ্লেষণ আছে। আমি সেদিকে যেতে চাই না। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই সংসদে আজকে আমরা যারা আছি, একসময় আমরা একদিকেই বসতাম। বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল, অল্প দুয়েকজন বা দুয়েকটি দল ছাড়া। এখন আমরা দুই অংশে সংযুক্ত আমি বিভক্ত বলছি না। সরকারি দল বাজেটের প্রশংসা করতে থাকুক, বিরোধী দল হালকা ও ভারী প্রশংসার সঙ্গে ওয়াচডগের কাজটাও করে যাক।
বিরোধী দলের নেতা কওমি মাদরাসার জন্য বাজেটে বরাদ্দ, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দ্রুত ফিরিয়ে আনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রবাসীদের সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, ওই পাচারকৃত অর্থের ৯ ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে ফিরিয়ে আনা যায়, তা হলে আমাদের কোনো বাজেট ঘাটতি থাকবে না।
মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদেরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিচার কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, কালপ্রিট যত বড়ই হোক তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
সময়ের আলো/আরবিএন