হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার কাজ পেতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি বিমানবন্দর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এখন তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিকভাবে এত বড় ও নামি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতে যুক্ত হওয়ার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছে।
দেশের বিমান পরিবহন খাতের ইতিহাসে এটিকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক অ্যাভিয়েশন হাব বা বিমান চলাচলের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তার ওপর আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা দিন দিন বাড়ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) যখনই থার্ড টার্মিনালে যাত্রীদের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দেওয়ার জন্য দ্বিতীয় একজন অপারেটর বা কোম্পানি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তারপরই বিশ্বখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসে।
আগ্রহী পাঁচ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান : মেনজিস অ্যাভিয়েশন (যুক্তরাজ্য), সুইসপোর্ট (সুইজারল্যান্ড), চেলেবি অ্যাভিয়েশন হোল্ডিং (তুরস্ক), ডনাটা (সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমিরেটস গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান) ও স্যাটস (সিঙ্গাপুর)। এই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দর সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুপরিচিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
এই আলোচনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বেবিচকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিমানবন্দর পরিভাষায় যাকে ‘প্যাসেঞ্জার গ্রাউন্ড সার্ভিস’ বা যাত্রীসেবাসংক্রান্ত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বলা হয়, মূলত সেই কাজের জন্যই কেবল দ্বিতীয় একজন অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে নতুন এই আধুনিক টার্মিনালের ‘কার্গো হ্যান্ডলিং’ অর্থাৎ আমদানি-রফতানি করা পণ্য ওঠানো-নামানোর পুরো দায়িত্ব আগের মতোই এককভাবে রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজ সংস্থা ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’-এর হাতেই থাকবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, নতুন যে দ্বিতীয় হ্যান্ডলার বা কোম্পানি আসবে, তাদের কাজ কেবল যাত্রীসেবা এবং সাধারণ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের একক ক্ষমতা ও দায়িত্ব শুধু বিমানের কাছেই রাখা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই পুরো বিষয়টি দেশের দ্রুত বড় হতে থাকা অ্যাভিয়েশন শিল্পের জন্য একটি বড় স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। দেশের বিমান খাতে প্রতিনিয়ত যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া, অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বড় মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে থাকাই মূলত এই আন্তর্জাতিক আগ্রহের মূল কারণ।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ মাফিদুর রহমান বলেন, একসঙ্গে এতগুলো আন্তর্জাতিক মানের বড় অ্যাভিয়েশন কোম্পানি বাংলাদেশে কাজ করার আগ্রহ দেখাচ্ছে- এমন ঘটনা অতীতে দেখা যায়নি, এটি সত্যিই বিরল। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার বিমান যোগাযোগ খাতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও গুরুত্ব কতটা বেড়ে চলেছে।
বড় দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা : এই কাজ কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাষ্ট্রদূতরা বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে তারা নিজ নিজ দেশের বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলোর অভিজ্ঞতা ও এই প্রকল্পে কাজ করার প্রবল আগ্রহের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন।
দীর্ঘদিনের একক আধিপত্যের অবসান ও সংস্কার : তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি দ্বিতীয় একজন অপারেটর নিয়োগ দেওয়ার এই সিদ্ধান্তটি দেশের বিমান খাতের একটি যুগান্তকারী এবং ঐতিহাসিক নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর কারণ হলো, গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করার পুরো একচেটিয়া দায়িত্ব বা মনোপলি ছিল কেবল বিমানের ওপর। এখন সেই জায়গায় প্রথমবারের মতো একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হতে যাচ্ছে।
বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আওতাভুক্ত কাজগুলো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল। এর মধ্যে রয়েছে, উড়োজাহাজের কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ করা, যাত্রীদের লাগেজ বা মালামাল ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাত্রীদের চেক-ইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়েতে র্যাম্প অপারেশন পরিচালনা করা। একটি উড়োজাহাজ অবতরণ করার পর সেটিকে দ্রুত আবার ওড়ার উপযোগী (টার্ন অ্যারাউন্ড সার্ভিস) করে তোলা।
বাংলাদেশে যাতায়াতকারী বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছিল যেন এই খাতে বিমানের একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ করে প্রতিযোগিতা বাড়ানো হয়। তাদের যুক্তি ছিল, অন্য অভিজ্ঞ কোম্পানি এলে সেবার মান অনেক উন্নত হবে, বিমান ল্যান্ড করার পর আবার ওড়ার জন্য প্রস্তুত হতে সময় কম লাগবে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারবে।
দেশি বেসরকারি বিমান সংস্থা নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এয়ারলাইন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্ত স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, পুরো বিষয়টি আরও বিশদ ও গভীরভাবে বিবেচনা করা দরকার ছিল। এমনকি এই সিদ্ধান্তটি যদি পরবর্তী ধাপেও নেওয়া হতো, তা হলেও কোনো সমস্যা হতো না। তবে পরিস্থিতি যাই হোক, আপাতত যাত্রীসেবার হ্যান্ডলিংয়ে অন্তত একটা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।
টাস অ্যাভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মুজিবুল হক বলেন, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ (পণ্য কেন্দ্র) এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং- এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমই আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ ও পেশাদার অপারেটরদের দিয়ে চালানো উচিত।
তিনি আরও বলেন, এই সবকিছুর মালিকানা বা স্বত্ব পুরোপুরি সরকারের কাছেই থাকতে পারে, তাতে কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু এগুলো পরিচালনার মূল দায়িত্ব বিশ্বমঞ্চে প্রমাণিত দক্ষ ও অভিজ্ঞ কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়া দরকার।
কার্গো হ্যান্ডলিং নিয়ে বিতর্ক ও উদ্বেগ : যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা তৈরির সিদ্ধান্ত সবাই সাধুবাদ জানালেও, থার্ড টার্মিনালের একদম নতুন ও স্বয়ংক্রিয় ‘কার্গো ভিলেজ’-এর পণ্য ব্যবস্থাপনার কাজ এককভাবে বিমানের হাতে রাখার সিদ্ধান্তটি নিয়ে খোদ বিমান খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন।
নভোএয়ারের প্রধান মফিজুর রহমান এই বিষয়ে বিমানের অতীত রেকর্ড টেনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিমানের বর্তমান কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের মান আদৌ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কি না, তা নিয়ে বাজারে যথেষ্ট বিতর্ক ও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের কাজের সক্ষমতা, দক্ষতা এবং সততা- এই দুটি বিষয়েই ব্যবসায়ী ও এয়ারলাইন্সগুলোর মনে গুরুতর উদ্বেগ ও সংশয় রয়েছে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান মাফিদুর রহমানও মনে করেন, নতুন টার্মিনালে যে অত্যাধুনিক কার্গোব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, তার থেকে শতভাগ সুবিধা পেতে হলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
তিনি বলেন, তৃতীয় টার্মিনালে যেসব যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি বসানো হয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত আধুনিক এবং বৈশ্বিক মানের। এগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ অপারেটরের প্রয়োজন। যদি সঠিক এবং দক্ষ পেশাদার মানুষদের খুঁজে এনে এই আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার কাজে লাগানো যায়, তবে আমাদের অ্যাভিয়েশন খাত নিশ্চিতভাবে নতুন এক গতি পাবে।
বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানিয়েছেন, তৃতীয় টার্মিনালের বিশাল কাজের চাপ সামলানোর জন্য বিমান ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মানের প্রয়োজনীয় আধুনিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে। একই সঙ্গে এই টার্মিনালের কাজ সুচারুভাবে করার জন্য অতিরিক্ত ১ হাজারেরও বেশি নতুন কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
বিমানের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বলেন, আমরা তৃতীয় টার্মিনালে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে যাত্রীসেবা এবং কার্গো হ্যান্ডলিং- উভয় কার্যক্রমই সফলভাবে পরিচালনা করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত আছি।
তিনি আরও জানান যে, বিমান কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা আধুনিক করতে একটি জাপানি কনসোর্টিয়ামের (গ্রুপ) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রীসেবা দেওয়ার জন্য দ্বিতীয় কোনো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার বা কোম্পানি নিয়োগের ব্যাপারে বেবিচকের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত চিঠি তারা পাননি।
চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর মূলত জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোয়েই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশনের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী জাপানি কনসোর্টিয়ামই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত এই তৃতীয় টার্মিনালের সার্বিক পরিচালনা, দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের মূল দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
সময়ের আলো/আআ