বর্ষার প্রবল বর্ষণে ভাসছে দেশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টিতে কোথাও দেখা দিয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা, কোথাও বা পাহাড়ধসে ঘটছে প্রাণহানি। অতিবৃষ্টির এই মৌসুমে জনমনে ঘুরপাক খায় আবহাওয়া দপ্তরের নানা পরিসংখ্যান। এই যেমন সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় মাত্র ৬ ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টির তথ্য জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। কিন্তু এই ‘মিলিমিটার’ এককে বৃষ্টির হিসাবের আসল অর্থ কী এবং এটি কীভাবে মাপা হয়, তা জানা জরুরি।
মিলিমিটার বৃষ্টির সহজ সমীকরণ
বৃষ্টি পরিমাপের আন্তর্জাতিক একক হলো মিলিমিটার। যদি কোনো সমতল পৃষ্ঠে পড়া বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত না হয়ে, অন্য কোথাও গড়িয়ে না গিয়ে কিংবা বাষ্পীভূত না হয়ে ঠায় জমে থাকে, তবে সেই পানির উচ্চতাই হলো বৃষ্টির পরিমাণ। আরও সহজভাবে বললে, ১ মিলিমিটার বৃষ্টি মানে প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ১ লিটার পানি পড়া। সেই হিসাবে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টির অর্থ হলো, ওই সময়ের মধ্যে ওই এলাকার প্রতি বর্গমিটারে ৭৬ লিটার পানি আকাশ থেকে নেমেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে তাকে ‘ভারী’ এবং ৮৮ মিলিমিটারের বেশি হলে ‘অতিভারী’ বৃষ্টি বলা হয়।
যেভাবে মাপা হয় বৃষ্টির পরিমাণ
বৃষ্টির এই হিসাব নিখুঁতভাবে পরিমাপের জন্য ব্যবহার করা হয় ‘রেইন গেজ’ নামক বিশেষ ধাতব পাত্র। খোলা আকাশে মাটি থেকে প্রায় ৩০ ইঞ্চি উঁচুতে এটি স্থাপন করা হয়, যাতে আশপাশের গাছপালা বা ভবনের কারণে পরিমাপে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। রেইন গেজের মুখে থাকা ফানেল দিয়ে পানি একটি সংগ্রাহক পাত্রে জমা হয় এবং পরে সুনির্দিষ্ট স্কেল দিয়ে তা মাপা হয়। বর্তমানে ম্যানুয়াল পদ্ধতির পাশাপাশি দেশে ২২৫টিরও বেশি স্বয়ংক্রিয় ‘টিপিং বাকেট’ রেইন গেজ বা অটোমেটিক ওয়েদার স্টেশন রয়েছে, যা প্রতি মুহূর্তে কখন কত জোরে বৃষ্টি হচ্ছে, সেই ডিজিটাল তথ্য কম্পিউটারে পাঠিয়ে দেয়।
রেকর্ড বৃষ্টি ও আবহাওয়ার বর্তমান রূপ
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে বছরের মোট ৮০ শতাংশ বৃষ্টিপাত হয়। বিশেষ করে সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মেঘ আটকে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত ঘটায়। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫৯০ মিলিমিটার বৃষ্টির ঐতিহাসিক রেকর্ড রয়েছে ২০০১ সালের ১৪ জুন, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে।
বছরের জুলাই মাসটি দেশের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ মাস, যার স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ৫২৩ মিলিমিটার। আবহাওয়াবিদদের মতে, জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হলেও জুলাইয়ের শুরুতেই মৌসুমি বায়ু প্রবলভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এছাড়া উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপটি এবার তার স্বাভাবিক রুট বদলে চট্টগ্রাম ও উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়ায় ওই অঞ্চলে বৃষ্টি ও দুর্যোগ বেশি বাড়ছে। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে চলমান জলবায়ু পরিবর্তন ও ‘এল নিনো’র বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ার কারণেও এখন স্বল্প সময়ে দেশজুড়ে এমন অতিভারী বৃষ্টিপাত দেখা যাচ্ছে, যা আগামী আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
সময়ের আলো/আআ