প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, বাংলাদেশ কোনো একক অংশীদারিত্বের ওপর নির্ভর করতে চায় না। বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক সহযোগিতার মাধ্যমে পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করতে চায়।
রোববার (২৬ জুলাই) নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক : আস্থা বৃদ্ধি ও নতুন দিকনির্দেশনা’ শীর্ষক সেমিনারে রোববার প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমন মন্তব্য করেন।
উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আগামী দিনে আরও গভীর, বিস্তৃত ও ফলপ্রসূ হবে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের মাধ্যমে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। একইসঙ্গে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি গঠনের ঘোষণা দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
তিনি আরও বলেন, অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি গঠনের ঘোষণা শুধু একটি কূটনৈতিক অর্জন নয়, এটি পারস্পরিক আস্থা, গভীর সহযোগিতা ও যৌথ সমৃদ্ধির ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি অঙ্গীকার। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী কূটনীতি, দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা এবং সব উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক জোরদারে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে প্রস্তাবিত ‘২+২ সংলাপ’ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের প্রথম কৌশলগত সংলাপ দ্রুত আয়োজনের বিষয়ে বাংলাদেশ আশাবাদী। চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের সদ্য অনুমোদিত পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনেও দুই দেশের সহযোগিতার বড় সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সেই ধারাবাহিকতায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এই লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদনমুখী শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। উৎপাদনশিল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপার্কে চীনা বিনিয়োগকে বাংলাদেশ স্বাগত জানায়। একইসঙ্গে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বাড়িয়ে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাবে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় স্বার্থ, শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ভিত্তিতে আগামী দিনে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক হবে।
সেমিনারে পররাষ্ট্র সচিব এইচ ই আসাদ আলম সিয়াম বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি সাম্প্রতিক চুক্তি, প্রটোকল, গণমাধ্যম সহযোগিতা এবং কৃষি, পানি নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খল, প্রযুক্তি ও বহুপাক্ষিক ফোরামে সহযোগিতার বিষয় উল্লেখ করেন। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রতিশ্রুতি ও বিনিয়োগকে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন প্রকল্পে রূপান্তর করা।
সেমিনারে এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো অ্যাম্বাসেডর মোহাম্মদ সুফিউর রহমান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে বলেন, বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। টেকসই সহযোগিতা শুধু স্বল্পমেয়াদি আর্থিক স্বার্থের ওপর নির্ভর করতে পারে না; বরং ভূ-অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, সংযোগ এবং পারস্পরিক নিরাপত্তাকে ভবিষ্যৎ সম্পৃক্ততার কেন্দ্রে রাখতে হবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের সংস্কৃতি বিষয়ক কাউন্সেলর লি শাও ফেং বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা কোনো রাজনৈতিক শর্ত বা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত নয়। পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং উভয়ের লাভের নীতির ভিত্তিতেই বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা এগিয়ে যাচ্ছে। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং নিজস্ব উন্নয়ন পথের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বাংলাদেশের উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা কোনো রাজনৈতিক শর্ত বা ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত নয়। বরং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, সমতা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতেই এ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ওই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘নতুন যুগে চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গড়ে তোলার ঘোষণা দেন, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বাংলাদেশ ও চীনের সহযোগিতা এখন আর শুধু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। বিনিয়োগ, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগের মতো ক্ষেত্রেও দুই দেশ নতুন নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে একসঙ্গে কাজ করছে।
সেমিনারে চীনের সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (এসআইআইএস) সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া স্টাডিজের পরিচালক ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. লিউ জংই সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে অংশ নেন।
সময়ের আলো/আআ