৬শ কোটির যন্ত্র কেজিতে বিক্রি

এসএম আলমগীর

জাতীয়

গরিব খামারিদের সমবায়ী একটি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা। এতে আছে সরকারেরও অংশীদারিত্ব। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠানটি একেবারে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে।

2026-08-01T00:35:55+00:00
2026-08-01T00:36:11+00:00
 
  শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬,
১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
৬শ কোটির যন্ত্র কেজিতে বিক্রি
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩৫ এএম  আপডেট: ০১.০৮.২০২৬ ১২:৩৬ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
গরিব খামারিদের সমবায়ী একটি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা। এতে আছে সরকারেরও অংশীদারিত্ব। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠানটি একেবারে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। ভারতে পালিয়ে যাওয়া পতিত সরকারের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তুষ্ট করতে এবং মেশিনারিজ ক্রয়ের নামে অর্থ লুটপাটের জন্য কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই এবং সম্পূর্ণ অনুপযোগী জায়গা ফরিদপুরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকায় গড়ে তোলা হয়েছিল মিল্কভিটার দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। শত শতকোটি টাকার মেশিনারিজ বিদেশ থেকে এনে স্থাপন করা হয়েছিল। অথচ সেই মেশিন একটি দিনের জন্যও চালু করা হয়নি, বছরের পর বছর পড়ে থেকে জং ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। 

একইভাবে নরসিংদী ও রংপুরে গড়ে তোলা আধুনিক দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার শতকোটি টাকার যন্ত্রও নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে সব মিলিয়ে মিল্কভিটার কারখানার ৬৪৮ কোটি টাকার মেশিনারিজ এখন ভাঙারির দরে বিক্রি করার উপক্রম হয়েছে। পতিত আওয়ামী সরকারের দেড় দশকে মিল্কভিটার কারখানার জন্য কেনা এই ৬৪৮ কোটি টাকার মেশিনারিজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। কারণ এসব মেশিন কেনা হয়েছে বিদেশ থেকে, কিন্তু মেশিন চালানোর মতো দক্ষ কারিগর দেশে নেই, বিদেশ থেকেও আনা হয়নি। তা ছাড়া সিরাজগঞ্জ ও পাবনা এলাকায় ডেইরি ফার্ম বেশি, খামারির সংখ্যাও বেশি। কিন্তু শুধু শেখ হাসিনাকে তুষ্ট করতেই ফরিদপুরে স্থাপন করা হয় ৩৮৭ কোটি টাকার কারখানা। 

অথচ ফরিদপুর এলাকায় ডেইরি ফার্ম ও দুগ্ধ খামারি বেশি নেই। এ কারণে কাঁচামাল সংকট হবে উল্লেখ করে তখন সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে ফরিদপুরে কারখানা স্থাপনে আপত্তি জানানোর পরও তৎকালীন চেয়ারম্যান ও শেখ হাসিনার আত্মীয় শেখ নাদির হোসেন লিপু সেখানে এই গরিব খামারিদের ও সরকারের শত শতকোটি টাকা খরচ করে ওই কারখানা স্থাপন করেছিলেন। মন্ত্রণালয়ের আপত্তি সত্ত্বেও কারখানা স্থাপনের পেছনের কারণ হিসাবে তখন তিনি জানিয়েছিলেন- ‘ঊর্ধ্বতনদের চাপে’ ফরিদপুরে কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 

একইভাবে নরসিংদী ও রংপুরে কারখানা স্থাপন ও মেশিন ক্রয়ও করা হয়েছিল কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই এবং অপরিকল্পিতভাবে। ফলস্বরূপ কারখানাগুলোর মেশিনারিজ বছরের পর বছর পড়ে থেকে এখন নষ্ট হয়ে গেছে। এসব কারখানা এখন মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ ও গরিব খামারিদের গলার কাঁটা হয়ে গেছে। মিল্কভিটার বর্তমান প্রশাসন এসব মরিচা পরা, নষ্ট মেশিনারিজ কেজিদরে বিক্রির চিন্তাভাবনা করছে। দেশের দুগ্ধ খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড বা মিল্কভিটা। 

‘কৃষকের দুধ, কৃষকের প্রতিষ্ঠান’ স্লোগানে শুরু হওয়া এই সমবায়ী প্রতিষ্ঠান বিগত সরকারের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে এখন ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই ৬৪৮ কোটি টাকার ৩টি প্রকল্প নেওয়া, ৮০ কোটি টাকা খরচের পর প্রকল্প বাতিল, আর শতকোটি টাকার আমদানি করা মেশিন বছরের পর বছর ধরে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে লোকসানের বোঝা বাড়ছে, বন্ধ হচ্ছে কারখানা, আর ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ দুগ্ধ খামারি।

সম্ভাব্যতা ছাড়াই ৬৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প : ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মিল্কভিটা ৩টি বড় প্রকল্প হাতে নেয়। মোট ব্যয় ধরা হয় ৬৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ফরিদপুর ডেইরি ফ্যাক্টরি প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৩৮৭ কোটি টাকা। কিন্তু ৬ বছর পর দেখা গেল প্রকল্পটির কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সে সময় স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল- ফরিদপুরে কাঁচামালের ব্যাপক সংকট হবে এবং পণ্য বিক্রির যথেষ্ট বাজার নেই। কারখানা অব্যবহৃত পড়ে থাকবে। শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়েছে।  

এ ছাড়া নরসিংদী পানি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্লান্টের জন্য তখন আমেরিকা থেকে আধুনিক মেশিন আমদানি করা হলেও প্রশিক্ষিত লোকবল না থাকায় সেটি আজও চালু করা যায়নি। পড়ে থেকে এসব মেশিনও জং ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। আবার রংপুরের দুগ্ধপ্রক্রিয়াজাত কারখানারও একই দশা। এই দুই কারখানাতে প্রায় ২৬০ কোটি টাকার মেশিনারিজ ক্রয় করা হয়েছিল। 

এভাবে খামারি ও কৃষকের ঘামে গড়া এই সমবায় প্রতিষ্ঠানের কোটি টাকার মেশিনে মরিচা ধরা, প্রকল্পে লোকসান আর ব্যবস্থাপনায় অবহেলা জর্জরিত ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনার অভাব আর রাজনৈতিক চাপেই মিল্কভিটার এই দশা। শতকোটি টাকার মেশিনের লোহা এখন আর কোনো কাজে লাগছে না, চাকাও ঘোরে না। 

মিল্কভিটা বেসরকারি খাতে ছাড়ার চিন্তাও করা হয়েছিল : এভাবে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে লোকসানের পর লোকসান দিতে থাকায় তৎকালীন সরকার একসময় মিল্কভিটাকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ারও চিন্তা করেছিল। মিল্কভিটার অচল কারখানাগুলোকে ফের চালু করে প্রতিষ্ঠানটির ইউএইচটি মিল্ক, কনডেন্সড মিল্ক ও বোতলজাত পানির ব্যবসা ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব ঠিকাদারদের হাতে ছাড়তে চেয়েছিল তখনকার প্রশাসন। 

মিল্কভিটার তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমর চান বণিক গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, আমাদের পরিচালন দুর্বলতা ও কৌশলগত কারণে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা যায়নি। এখন আমরা এখান থেকে আয় বাড়াতেই (মিল্ক ভিটাকে) বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিচ্ছি।

ওই সিদ্ধান্তের আলোকে তখন প্রতিষ্ঠানটি চারটা কারখানার মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য আগ্রহপত্র (ইওআই) আহ্বান করা হয়। কারখানাগুলোর মধ্যে আছে দুটি ইউএইচটি মিল্ক প্লান্ট, একটি কনডেন্সড মিল্ক প্লান্ট এবং একটি ক্যান তৈরির প্লান্ট। এ ছাড়া একটি বোতলজাত পানির প্লান্ট স্থাপন ও চালুও করতে হবে। এসব কারখানার মধ্যে ক্যান তৈরির প্লান্ট, কনডেন্সড মিল্ক প্লান্ট ও একটি ইউএইচটি মিল্ক প্লান্ট সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ঘাটে অবস্থিত। একটি ডেইরি প্লান্ট সিরাজগঞ্জে, দ্বিতীয় ইউএইচটি মিল্ক প্লান্ট ও দ্বিতীয় ডেইরি প্লান্ট ঢাকায় এবং পানি বোতলজাত কারখানাটি নরসিংদীর শিবপুরে। পরে আর সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

কী ভাবছে মিল্কভিটার বর্তমান প্রশাসন : গত এপ্রিল মাসে মিল্কভিটার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন এস এম আমীর হামজা শাতিল। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নিয়েই তিনি সবার আগে বিগত সরকারের আমলে কারখানা স্থাপনের নামে অর্থ তছরুপের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উদ্যোগ নেন। এতে তিনি দেখতে পান বিগত সময়ে সরকারের খামখেয়ালি এবং দুর্নীতির কারণে মিল্কভিটাকে একটি ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছিল। এখন তিনি চেষ্টা করছেন কীভাবে মিল্কভিটাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো যায় এবং ধীরে ধীরে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়। 

মিল্কভিটার চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা সময়ের আলোকে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে মিল্কভিটায় মোট ৬৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ২০০৭ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। এই ৬৪৮ কোটি টাকার মেশিনারিজ এখনও টোটালি বন্ধ। এর একটিও চলে না। আমাদের যে মেশিনগুলো এখন চলছে সেগুলো ১৯৭৭-৭৮ সালে স্থাপন করা। এর বাইরে ২০০৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যেসব মেশিন ক্রয় করা হয়েছে তার একটাও চলে না। 

এগুলো সব পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে।  মেশিনগুলো কেনার পর থেকেই ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে কারখানা মেশিনগুলো বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে। এসব মেশিনের বেশিরভাগই কেজি দরে বিক্রি করার মতো অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের হয়তো সে পথেই যেতে হবে। তারপরও আমরা চেষ্টা করব যেসব যন্ত্রাংশ কিছুটা ভালো আছে- সেগুলো ব্যবহার করা যায় কি না। 

দুদককে তদন্তের আহ্বান : অন্যদিকে এভাবে কারখানা স্থাপনের নামে রাষ্ট্রের টাকা লোপাটের বিষয়টি তদন্ত করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানান মিল্কভিটার বর্তমান চেয়ারম্যান। 
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, প্রথমে আমরা নিজেরা তদন্ত করেছি। এ সময় দেখেছি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আন্দোলনের মধ্যে এখানকার অনেক ফাইলপত্র নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। 

যে জিনিস আমরা পেয়েছি সেগুলো আমরা জোগাড় করেছি। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ও আমাদের সহযোগিতা করছে। এখন আমরা দুদককে চিঠি দিয়েছি এবং আমরা পুলিশকে চিঠি দিয়েছি ফরেন্সিক টেস্টের জন্য। বিশেষ করে সিআইডিকে চিঠি দিয়েছি আমরা। আসলে একটা বড় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আমরা গুছিয়ে কাজ করছি, দুই-তিনটা স্পেসিফিক কেস আমরা হাতে নিয়েছি যেগুলো তদন্তাধীন রয়েছে এবং দুদক তদন্ত করছে, মন্ত্রণালয়ও তদন্ত করছে।

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   কোটি  মিল্কভিটা  যন্ত্র  কেজি  বিক্রি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: