জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ লুটপাটের নতুন লাইসেন্স

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজনীতি

পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগকে ‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ হিসেবে দেখছে সংসদের প্রধান বিরোধী

2026-08-09T01:13:37+00:00
2026-08-09T01:13:37+00:00
 
  রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬
রাজনীতি
জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন
জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ লুটপাটের নতুন লাইসেন্স
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১:১৩ এএম 
মিয়া গোলাম পরওয়ার। ছবি : সংগৃহীত
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগকে ‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ হিসেবে দেখছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, প্রতিযোগিতা তৈরির নামে শেষ পর্যন্ত কয়েকটি প্রভাবশালী বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে জ্বালানি বাজার তুলে দেওয়া হতে পারে। 

শনিবার জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ’ নিয়ে জামায়াতের বক্তব্য ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার জন্য আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাত সংস্কারের বদলে এর নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার খরচ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে।

নতুন বিপিসি চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার চার দিনের মধ্যে খসড়া তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।’’ 
বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম কমবে- সরকারের এমন যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে পরওয়ার বলেন, এ ব্যবসায় গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাঙ্ক টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে বাস্তবে হাতেগোনা কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীই এ বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা রাখে।

এতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিপিসিকে অদক্ষ ও লোকসানি দেখিয়ে বেসরকারিকরণের যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াত।

দলটির সেক্রেটারির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি যথাক্রমে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা লোকসান করেছিল।

জামায়াতের দাবি, বর্তমান জ্বালানি সংকটও বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা নয়। এটি মূলত বিশ্ববাজার ও ভূরাজনৈতিক সংকটের ফল। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও দেশে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে দাম না বাড়ানোর কারণে বিপিসি প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে বলে জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকট কাজে লাগিয়ে সরকার তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।


এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে দরদাতা সংকট, বেশি দাম ও সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

পরওয়ার বলেন, ‘দ্রুততা আর স্বচ্ছতা পরস্পরবিরোধী নয়। কিন্তু এখানে দ্রুততার নামে স্বচ্ছতাই বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি বাজার কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে গেলে প্রতি লিটারে সামান্য বাড়তি মুনাফাও বছরে হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়ে পরিণত হতে পারে।

জ্বালানি তেলকে সাধারণ পণ্য নয় বরং কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, বিমান চলাচল ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন জামায়াতের এই নেতা।

বাংলাদেশে একটি মাত্র শোধনাগার- ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং সীমিত মজুদ সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় বেসরকারি কোম্পানিকে রাষ্ট্র কীভাবে নির্দেশ দেবে। অলাভজনক দুর্গম এলাকায় জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্বও বেসরকারি কোম্পানি নেবে কি না, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এটি শুধু বিরোধী দলের রাজনৈতিক বক্তব্য নয় দাবি করে পরওয়ার সিপিডি, ক্যাব ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামত তুলে ধরেন।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, জ্বালানি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় এটি মুনাফার খাত না করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে সীমিত মুনাফায় পরিচালনা করাই জনস্বার্থসম্মত।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম জ্বালানিকে মুনাফার বদলে সেবাখাত হিসেবে বিবেচনার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানার আশঙ্কা তুলে ধরে পরওয়ার বলেন, বেসরকারি ব্যবস্থায় গেলে এলপিজি খাতের মতো সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে।

জামায়াতের দাবি, গত ২ আগস্ট বাঙ্কারিং নীতিমালায় পরিবর্তন এনে মেরিন ফুয়েল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

জামায়াত পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে।


একই সঙ্গে খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করে অন্তত ৬০ দিনের জনমত গ্রহণ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানি এবং বেসরকারিকরণের বদলে বিপিসির সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে।

দলটি স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার নিয়োগ, ক্রয়ে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণ প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট ও কৌশলগত মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা খর্বের সব সুপারিশ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পাবনা-১ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন,  সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ প্রমুখ।

সময়ের আলো/এসএকে



  বিষয়:   জ্বালানি খাত  বেসরকারিকরণ  লুটপাট  লাইসেন্স  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: