বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নত গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও বৃত্তির সুযোগের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া এখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও দেশটিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে ভর্তি, ভিসা, খরচ ও কাজের নিয়ম না জেনে সিদ্ধান্ত নিলে পরে নানা জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনার অন্যতম বড় সুবিধা হলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় দেশটির শক্ত অবস্থান। সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কোরিয়া অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইয়োনসেই ইউনিভার্সিটি, কোরিয়া ইউনিভার্সিটি, পোহাং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, প্রকৌশল, ব্যবসা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মিডিয়া, ডিজাইন ও বায়োটেকনোলজিসহ নানা বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় বাছাইয়ের সময় শুধু র্যাঙ্কিং দেখলেই হবে না। পছন্দের বিষয়, কোর্সের ভাষা, টিউশন ফি, বৃত্তি, গবেষণার সুযোগ, আবাসন ও ভবিষ্যৎ চাকরির সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।
ভর্তির যোগ্যতা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে আলাদা। স্নাতকে সাধারণত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সনদ, ট্রান্সক্রিপ্ট, পাসপোর্ট, স্টাডি প্ল্যান এবং ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণ প্রয়োজন হয়। মাস্টার্সে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি এবং পিএইচডিতে সাধারণত মাস্টার্স ডিগ্রির পাশাপাশি গবেষণাসংক্রান্ত নথি প্রয়োজন হতে পারে। ইংরেজি-মাধ্যমের প্রোগ্রামে IELTS বা TOEFL এবং কোরিয়ান-মাধ্যমের প্রোগ্রামে TOPIK চাওয়া হতে পারে।
আবেদনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সময়সূচি, যোগ্যতা, ফি ও প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা জরুরি। সাধারণত আবেদনপত্র, শিক্ষাগত সনদ, ট্রান্সক্রিপ্ট, ভাষার সনদ, ব্যক্তিগত বিবৃতি বা স্টাডি প্ল্যান, সুপারিশপত্র, সিভি এবং আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ লাগতে পারে।
ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পর ভিসার প্রস্তুতি নিতে হয়। ডিগ্রি প্রোগ্রামের জন্য সাধারণত D-2 স্টুডেন্ট স্ট্যাটাস প্রযোজ্য। বাংলাদেশ থেকে আবেদন করার ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। ভিসার কাগজপত্র, ফি ও প্রক্রিয়া সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
খরচও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়, বিষয় ও শহর অনুযায়ী টিউশন ফি ভিন্ন হয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক কম খরচ হতে পারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর মাসিক জীবনযাত্রার ব্যয় আনুমানিক ৭ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ কোরিয়ান ওন হতে পারে। সিউলে খরচ সাধারণত বেশি। ডরমিটরি, শেয়ারড বাসা, গশিওন বা ওয়ান-রুমে থাকার সুযোগ রয়েছে।
বৃত্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত সরকারি কর্মসূচি হলো গ্লোবাল কোরিয়া স্কলারশিপ বা GKS। এর পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ফলাফল ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আংশিক বা পূর্ণ টিউশন মওকুফ করে। তবে বৃত্তির যোগ্যতা ও কোটা প্রতিবছর পরিবর্তিত হতে পারে।
D-2 স্ট্যাটাসে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ রয়েছে। তবে অনুমতি ছাড়া কাজ করা যাবে না। তাই পার্টটাইম চাকরিকে পড়াশোনার পুরো খরচ চালানোর প্রধান উৎস হিসেবে ধরে দেশটিতে যাওয়া উচিত নয়।
কোরিয়ান ভাষা না জানলেও কিছু ইংরেজি-মাধ্যমের প্রোগ্রামে পড়া সম্ভব। তবে দৈনন্দিন জীবন, স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভবিষ্যতে চাকরির ক্ষেত্রে কোরিয়ান ভাষা বড় সুবিধা দিতে পারে।
পড়াশোনা শেষে যোগ্য শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট শর্তে D-10 স্ট্যাটাসে চাকরি খোঁজার সুযোগ পেতে পারেন। চাকরি পাওয়ার পর যোগ্যতা ও পেশা অনুযায়ী কর্মসংস্থানভিত্তিক স্ট্যাটাসে যাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে ডিগ্রি শেষ করলেই চাকরি বা স্থায়ী বসবাস নিশ্চিত নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার আগে নিজের বিষয়, বাজেট, ভাষাগত দক্ষতা, বৃত্তির সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা পরিষ্কার করা। ভর্তি ও ভিসার নিয়ম পরিবর্তনশীল হওয়ায় আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাস এবং সরকারি পোর্টালের সর্বশেষ তথ্যই চূড়ান্ত হিসেবে অনুসরণ করা উচিত।
সময়ের আলো/এমকে