ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এ সময় তার সঙ্গে যান ছোট বোন শেখ রেহানা। শেখ হাসিনার পতনের আগে ও পরে তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের প্রায় সবাই দেশ ছেড়ে পালায়। জুলাইজুড়ে দেশ ছাড়ে হাসিনার আত্মীয়রা। এপ্রিল থেকে আগস্টে একে একে শেখ পরিবারের অন্য স্বজনরা বিদেশে পাড়ি জমায় বলে ইমিগ্রেশনের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
শেখ পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সবাই গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হন। অথচ শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে এই পরিবারের সদস্যরা ছিলেন ক্ষমতা প্রয়োগের শীর্ষে। এই পরিবার বা শেখ হাসিনার আত্মীয়স্বজনদের প্রায় দুই ডজন ব্যক্তি মন্ত্রীপদমর্যাদা, এমপি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দলীয় দায়িত্বে থেকে সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন।
সব মিলিয়ে সরকারের নড়বড়ে অবস্থা দেখে অনেকটা নিভৃতে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। তার বড় ভাই, যুবলীগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা শেখ ফজলে শামস পরশ দেশ ছাড়েন ২০২৪ সালের ২৫ জুন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তারা আর ফেরত আসেননি। জুলাই মাসে দেশ ছাড়েন ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম (৬ জুলাই ২০২৪) ও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ (৫ জুলাই ২০২৪), চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন (১২ জুলাই ২০২৪), শেখ সোহেল (৬ জুলাই ২০২৪), ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী) (১৪ জুলাই ২০২৪)।
শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। সরকার পতনের আগেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল জয় দেশ ছাড়েন। শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জয় নিয়মিত দেশে আসতেন এবং সরকারি-বেসরকারি কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। তিনি শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।
শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল) ২০২৪ সালের ১২ জুলাই দেশ ছাড়েন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচিত হন। সংস্থাটির আঞ্চলিক কার্যালয় ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনকালে সায়মা ওয়াজেদ দিল্লিতেই ছিলেন। সরকার পতনের পর গত বছরের জুলাইয়ে সায়মা ওয়াজেদকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠায় ডব্লিউএইচও। তবে তিনি বেতন পান। সায়মা কখনো দিল্লি, কখনো দুবাই থাকেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক (ববি) আওয়ামী লীগের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) দেখাশোনা করতেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনি দেশে ও বিদেশে থাকতেন। সরকার পতনের সময় তিনি থাইল্যান্ডে ছিলেন। ২০২৪ সালের ২০ জুন দেশ ছাড়েন ববি। তার স্ত্রী ফিনল্যান্ডের নাগরিক। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন। এর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দফতরের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পে কাজ করেছেন।
শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি সে দেশের পার্লামেন্টের সদস্য। টিউলিপ সিদ্দিকের বোন আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী যুক্তরাজ্যের নাগরিক। তিনি বাংলাদেশে খুব একটা আসতেন না। রাজনীতিতেও তার সম্পৃক্ততা দেখা যায়নি।
তবে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ রেহানাকে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরে পাশে দেখা গেছে। সরকার পতনের দুদিন আগে তিনি যুক্তরাজ্য থেকে ঢাকায় আসেন। টিউলিপ যুক্তরাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা। শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতে যাওয়ার পর শেখ রেহানা লন্ডন ও ভারতে থাকছেন বলে আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন। তবে তিনি প্রকাশ্যে আসেননি।
চাচাতো ভাই শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল (২০ মে ২০২৪), চাচাতো ভাই শেখ হেলালের ছেলে শেখ তন্ময় (৪ জুন ২০২৪), ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী (১৭ এপ্রিল ২০২৪), শেখ সেলিমের ছেলে ও যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলে নাঈম (১৪ জুন ২০২৪) ও আরেক ছেলে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম (১৩ জুন ২০২৪), শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুর রহমান মারুফ (১৮ মে ২০২৪) দেশ ত্যাগ করেন।
২০২৪ সালের বিতর্কিত ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনে শেখ হাসিনাসহ তার স্বজনদের মধ্যে আটজন সংসদ সদস্য হন।আত্মীয়দের মধ্যে ছিলেন তার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, শেখ হেলালের ছেলে শেখ তন্ময় এবং ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী ও মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন চৌধুরী)।
শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ বেশ প্রভাবশালী ছিলেন। আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর বড় ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। বাবা ছিলেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ছেলে বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। দুজন মিলে পুরো বরিশাল অঞ্চলের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে বরিশালে সক্রিয় ছিলেন সাদিক আবদুল্লাহ। যুবলীগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ। এ ছাড়া অন্য আত্মীয়রা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর তার সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের একটি কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফোনটি করেছিলেন তাপস, অপর প্রান্তে ছিলেন শেখ হাসিনা। তাপস শেখ হাসিনাকে সালাম দিয়ে বলেন, ‘আমি একটু সিঙ্গাপুর যাব, যেতে চাচ্ছিলাম। আমি কি যেতে পারি?’ জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘হ্যাঁ, যাও। যাবা না কেন?’ এরপর তাদের মধ্যে আরও কিছু কথা হয়।
এই কল তাপস করেছিলেন ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে। কথোপকথন থেকে জানা যায়, তাপস সিঙ্গাপুর যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। তবে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে থামিয়ে দেয়। এ সময় তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করে সহায়তা চান। তাপস তড়িঘড়ি করে বিদেশ যাওয়ার ঠিক আগের দিন পর্যন্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলনে কয়েকশ মানুষ নিশ্চিত হত্যার শিকার হন। আন্দোলনে উত্তাল ঢাকাসহ সারা দেশ। আগের দিন ঢাকায় সরকারবিরোধী ‘দ্রোহযাত্রা’ নামে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, আইনজীবী, উন্নয়নকর্মী, মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ওই দিন বিকালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চূড়ান্তভাবে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি