ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাজেটে প্রতি বছরই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা খাতে বাড়ছে বরাদ্দ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও এ দুই খাতে মিলিয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৩৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। কিন্তু বিপুল এ অর্থ বরাদ্দের বিপরীতে নগরীর পরিচ্ছন্নতার চিত্র নিয়ে সন্তুষ্ট নয় নগরবাসী। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, খোলা জায়গা ও ড্রেনের পাশে এখনও নিয়মিত জমছে বর্জ্য; কোথাও নির্ধারিত সময়েও তা অপসারণ হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ, দক্ষ সংগ্রহ ও পরিবহন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, পুনর্ব্যবহার এবং নিরাপদ নিষ্পত্তির সমন্বিত ব্যবস্থা। ফলে প্রশ্ন উঠছে— বছরের পর বছর বরাদ্দ বাড়লেও রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কেন দৃশ্যমান হচ্ছে না?
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মোট ৪ হাজার ৫২৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫১১ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১১ শতাংশ। সিটি করপোরেশনের বাজেটে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৪ হাজার ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার বাজেট দিয়েছে। পরিচ্ছন্নতা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৩২৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ৮০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ কাগজে-কলমে পরিচ্ছন্নতা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে চারগুণের বেশি। দুই সিটি করপোরেশনের চলতি অর্থবছরের বাজেটে বর্জ্য ও পরিচ্ছন্নতা খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ৮৩৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
এত বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও নগরবাসীর বড় অভিযোগ— পরিচ্ছন্নতার কাঙ্ক্ষিত মান দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বিঅ্যান্ডএফ কোম্পানি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাতুয়াইলে একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা ভাবছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে বর্জ্য থেকে প্রায় ১৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদিত হবে, যা থেকে বছরে মোট প্রায় ৮১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এটি দৈনিক প্রায় ২২১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমতুল্য। এতে বর্জ্যরে সঠিক ব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, স্থানান্তর, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য পৃথকীকরণ ও নিরাপদ নিষ্পত্তির সমন্বিত ব্যবস্থা। ডিএনসিসির ৫১১ কোটি ৪১ লাখ টাকা ও ডিএসসিসির ৩২৭ কোটি টাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতায় বাজেট রাখা হয়েছে। এ বাজেটের বড় অংশই সরাসরি নতুন অবকাঠামো তৈরিতে যাচ্ছে না। এর মধ্যে অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি, নর্দমা ও নিকাশি পরিষ্কার, জ্বালানি বাবদ এবং ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে টাকা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বরাদ্দ বাড়লেও তার বড় অংশ পরিচালন ব্যয় ও শ্রমিকের মজুরিতে চলে যাচ্ছে। ফলে আধুনিক গাড়ি, যন্ত্রপাতি, বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো তৈরিতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকছে কি না সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এই বিপুল বর্জ্য দ্রুত সংগ্রহ ও অপসারণ করা না গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই নগরীর বিভিন্ন স্থানে বর্জ্যরে স্তূপ তৈরি হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এক দিনের হিসাবে ডিএনসিসি এলাকায় ৪ হাজার ৩৯১ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণের তথ্য প্রকাশ করা হয়। জুনে প্রকাশিত আরেক হিসাবে পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ করলেই হবে না। প্রয়োজন কার্যকর সংগ্রহব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পরিবহন, ট্রান্সফার স্টেশন এবং বৈজ্ঞানিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপযোগী অবকাঠামো ও সরঞ্জাম। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো উন্নয়নে দুই সিটি করপোরেশনই বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
তারা মনে করে, ঢাকায় এখনও বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা সীমিত। ফলে রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য, প্লাস্টিক, কাগজ, কাচ, চিকিৎসাবর্জ্যসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থায় যাচ্ছে। এভাবে শুধু বর্জ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়াকে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলা যায় না। বর্জ্যরে পরিমাণ কমানো এবং পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করাও ব্যবস্থাপনার অংশ। বড় বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কাজের ফলাফল। কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে— তার পাশাপাশি কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, কত টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, কতটি গাড়ি সচল ছিল, কতটি ট্রিপ হয়েছে এবং কত শতাংশ বর্জ্য নিরাপদভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে— এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঠিকাদারি কাজে কাজের পরিমাণ ও মান যাচাই না করে বিল পরিশোধের সুযোগ থাকলে অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই প্রতিটি ওয়ার্ডে বর্জ্য সংগ্রহের সময়সূচি, গাড়ির ট্রিপ, শ্রমিকের উপস্থিতি এবং বর্জ্য অপসারণের পরিমাণ ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা যেতে পারে।
অবশ্য ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় সমস্যা হচ্ছে উৎস থেকে বর্জ্য সংগ্রহের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের মূল ব্যবস্থার সমন্বয়। অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় সংগঠন আলাদাভাবে টাকা নেয়। এরপর সেই বর্জ্য কোথায়, কখন এবং কীভাবে সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থায় যাবে— তা সব জায়গায় সমানভাবে নিয়ন্ত্রিত নয়। ফলে নির্ধারিত স্থান ছাড়াও রাস্তার পাশে, খোলা জায়গায় কিংবা ড্রেনের মুখে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা দেখা যায়। এতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বলভাবে চলছে। এমনিতেই এখন যদি এলাকা থেকেও বর্জ্য সঠিকভাবে সরানো না যায় তা হলে তো রাস্তায় রাস্তায় বর্জ্যরে স্তূপ হয়ে যাবে। তখন সেখান থেকে মশা-মাছিসহ বিভিন্ন রোগবালাই ছড়িয়ে পড়বে। জনস্বাস্থ্য বিবেচনায়ও বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ করতে হবে। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পিছিয়ে রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রশাসক বলেন, সিটি করপোরেশনের অঞ্চলভিত্তিক বর্জ্যসহ জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নাগরিক সুবিধাদি ও সেবার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ‘ক্লিন সিটি-গ্রিন সিটি’ বাস্তবায়নের ধাপ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এই বাজেটের প্রতিটি টাকা জনগণের কল্যাণে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি। নগরবাসী পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক সময় সড়কের দুই পাশ দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য ও অব্যবস্থাপনায় অপরিচ্ছন্ন দেখা যায়। এ বর্জ্য অপসারণ, পরিবেশ পরিচ্ছন্নকরণের কাজ চলমান রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও কার্যকর করতে বিভিন্ন সময় উৎস থেকে বর্জ্য পৃথকীকরণ, নতুন ডাম্প ট্রাক যুক্ত করা এবং মাঠে তদারকি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হিসেবে উৎস থেকেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সবুজ (পচনশীল) ও হলুদ (অপচনশীল) রঙের ফাইবার বিন বা ঝুড়ি বিতরণ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঠে উপস্থিত থেকে ময়লা-আবর্জনা অপসারণ এবং যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা রোধে কঠোর নজরদারি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, নগরীর ক্রমবর্ধমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে তা সম্পদে পরিণত করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা ও জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। পরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে একদিকে যেমন নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমবে, অন্যদিকে জ্বালানি উৎপাদনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও