একদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিং, অন্যদিকে তীব্র গ্যাস সংকট- এই দুই সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের জনজীবন। রাজধানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। একই সঙ্গে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বাসাবাড়ি, শিল্প কারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন খাতে দেখা দিয়েছে ভোগান্তি। দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিদ্যুৎ না থাকা এবং রান্নার সময় গ্যাস না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা দিয়েছে।
গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন শিশু, বয়স্ক ও কর্মজীবী মানুষ। অনেক এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও স্বল্প সময়ের জন্য লোডশেডিং হলেও কোনো কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। এতে বাসাবাড়ির স্বাভাবিক কাজকর্মের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে বেশ কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে অনেক বাসাবাড়িতে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। আবার কোনো কোনো এলাকায় গভীর রাতে বা ভোরের দিকে সামান্য সময়ের জন্য গ্যাসের চাপ বাড়ছে। এতে রান্নাবান্না নিয়ে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে রান্নার সময় পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কেউ রাত জেগে রান্না করছেন, কেউ আবার বৈদ্যুতিক চুলা বা সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলে বৈদ্যুতিক চুলাও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ফলে একই পরিবারের ওপর গ্যাস ও বিদ্যুৎ দুই ধরনের সংকটের চাপ পড়ছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প ও ব্যবসা খাতেও। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানার উৎপাদন সময়সূচি পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ছোট খাবারের দোকানগুলোও গ্যাস সংকটে সমস্যায় পড়েছে। রান্নার কাজ সময়মতো শেষ করতে না পারায় ব্যবসায়ীদের বাড়তি খরচ হচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় ব্যয় আরও বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে খাবারের দামেও।
এদিকে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু করে টার্মিনালটি। শনিবার থেকে অনেকাংশে গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় সামিট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়িয়ে ১৫ আগস্ট রাত ২টার দিকে প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই গ্যাস সরবরাহ শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য গ্রাহকের গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়াতে সহায়তা করবে। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা এবং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সামিট এলএনজি জানিয়েছে, টার্মিনাল ও জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার কারিগরি সক্ষমতার মধ্যে থেকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য কার্যক্রম বজায় রেখে সর্বোচ্চ পরিমাণ গ্যাস সরবরাহে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ বাংলাদেশের শিল্পের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্যাসের ঘাটতি কমাতে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে সামিট।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া এসব কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের অসহনীয় দুর্ভোগের মধ্যে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ গ্যাস সংকট। বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকটে লোকজনের এখন নাকাল অবস্থা। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে অর্ধেকে। চট্টগ্রামে চাহিদার অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে না। সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা দিয়েছে। গ্যাস না পাওয়ায় গতকাল শুক্রবার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা।
চট্টগ্রামে গেল দুই সপ্তাহ ধরে চলছে গ্যাস সংকট। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথমে গ্যাস সংকট শুরু হয়। টার্মিনাল থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পর এক সপ্তাহ না পেরুতেই আবার সংকট শুরু। গেল কয়েক দিন ধরে চট্টগ্রামে চাহিদার অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাসা-বাড়িতে জ্বলছে না চুলা। সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে দেখা দিয়েছে দুর্ভোগ। চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে গ্যাস সংকট কেটে যাবে। আমরা অপেক্ষায় আছি। সংকটের কারণে গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া কিছুই করার নেই।
পিডিবি চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) আকবর হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ১৩শ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হয়। গ্রিড থেকে চট্টগ্রামে সরবরাহ আসে চাহিদার কম। মূলত এ কারণে চট্টগ্রামে লোডশেডিং বেড়েছে।
এদিকে শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর এলাকায় কয়েকশ চালক সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। চালকদের অবরোধের কারণে মুরাদপুর থেকে দুই নম্বর গেট পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সকালে সড়কটিতে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে চালকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে চালকদের বাগবিতণ্ডা হয়েছে।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার ভোরে ষোলশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্যাসের জন্য কয়েকশ সিএনজি অটোরিকশা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো ছিল। অনেক চালক গাড়ির ভেতরেই অপেক্ষা করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস না পাওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন কর্মীদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে ষোলশহরে সড়ক অবরোধ করে রাখেন।
সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন ফসিলের কর্মকর্তারা জানান, ইচ্ছাকৃতভাবে সিএনজি দেওয়া হচ্ছে না বিষয়টি এমন নয়। গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় সিএনজি অটোরিকশায় গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাদের কিছু করার নেই। সহসা সংকট কাটবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
পাঁচলাইশ থানার ওসি মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, অবরোধের খবর শুনে পুলিশের একটি টিম সেখানে যায়। পুলিশ দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে চালকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এরপর যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও