ডেঙ্গুতে জ্বর, মাথাব্যথা ও শরীরব্যথার পাশাপাশি রক্ত পরীক্ষায় প্লাটিলেটের মাত্রা কমে যাওয়ায় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। অনেকেই মনে করেন, প্লাটিলেট কমে গেলেই ডেঙ্গু গুরুতর হয়ে গেছে। তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ঘটে, যার একটি হলো রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যাওয়া। রোগের তীব্রতা বুঝতে চিকিৎসকেরা শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা নয়, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য সতর্কসংকেতও বিবেচনা করেন।
ডেঙ্গু শরীরে প্রবেশের পর কী হয়?
সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। কয়েক দিন পর সাধারণত জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং কখনো ত্বকে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বেশিরভাগ রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে।
ডেঙ্গুর অসুস্থতাকে সাধারণত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়— জ্বরের পর্যায়, সংকটকাল এবং সুস্থ হওয়ার পর্যায়। এর মধ্যে জ্বর কমে যাওয়ার সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সময় কিছু রোগীর রক্তনালি থেকে শরীরের তরল বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে কেন?
প্লাটিলেট রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ কণিকা, যা রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে। ডেঙ্গু সংক্রমণের সময় বিভিন্ন কারণে এর সংখ্যা কমে যেতে পারে। এর মধ্যে অস্থিমজ্জায় রক্তকণিকা তৈরির ওপর ভাইরাসের প্রভাব, প্লাটিলেট দ্রুত নষ্ট হওয়া এবং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া অন্যতম।
ডেঙ্গুর সময় শুধু প্লাটিলেট নয়, শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যাও কমে যেতে পারে। বিশেষ করে সংকটকালে প্লাটিলেট দ্রুত কমার পাশাপাশি রক্তের ঘনত্ব বাড়তে থাকলে তা রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
প্লাটিলেট কমলেই কি রক্তপাত হয়?
প্লাটিলেট কমে গেলেই যে রক্তপাত হবে, এমন নয়। ডেঙ্গুর গুরুতরতা নির্ধারণের সময় চিকিৎসকেরা রোগীর সামগ্রিক অবস্থা, রক্তপাতের লক্ষণ, রক্তের বিভিন্ন পরিবর্তন এবং রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়ার মতো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করেন।
তবে জ্বর কমার পর তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, বমি বা পায়খানায় রক্ত, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা অস্থিরতা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এগুলো গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত হতে পারে।
জ্বর কমার পর কেন বেশি সতর্ক থাকতে হয়?
ডেঙ্গুতে জ্বর কমে গেলেই রোগী পুরোপুরি বিপদমুক্ত— এমনটি সবসময় নয়। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর চলে যাওয়ার পরের এক থেকে দুই দিনের মধ্যে গুরুতর ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সংকটকালে রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে গেলে রক্তচাপ কমে গিয়ে শরীরে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ কারণে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখা জরুরি। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
প্লাটিলেট আবার কীভাবে বাড়ে?
ডেঙ্গুর সংকটকাল পার হওয়ার পর রোগী সুস্থ হওয়ার পর্যায়ে গেলে শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। এ সময় সাধারণত শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বাড়ার পর প্লাটিলেটের সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
তাই শুধু একটি রক্ত পরীক্ষার ফল দেখে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও শারীরিক পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া উচিত। ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ভাইরাসনাশক ওষুধ নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ, শরীরে পর্যাপ্ত তরল নিশ্চিত করা এবং রোগ গুরুতর হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেঙ্গুতে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা নয়, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে জ্বর কমার পর তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি বা রক্তপাতের মতো সতর্কসংকেত দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে যেতে হবে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ