ভারতের ‘ককরোচ’ আন্দোলন কি মোদির বিজেপিকে রাজনীতি বদলাতে বাধ্য করছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বয়ানেও

2026-08-17T18:57:44+00:00
2026-08-17T18:57:44+00:00
 
  সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
২ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ভারতের ‘ককরোচ’ আন্দোলন কি মোদির বিজেপিকে রাজনীতি বদলাতে বাধ্য করছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৫৭ পিএম 
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীদের উল্লাস। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আন্দোলনের অংশ হিসেবে হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভের পর তিনি পদত্যাগ করেন। ছবি : আল-জাজিরা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বয়ানেও দলটির প্রভাব রয়েছে। তবে তরুণদের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি আন্দোলন সেই অবস্থানে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। 

শিক্ষা, পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ইতোমধ্যে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের চাপের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানও পদত্যাগ করেন। বিষয়টি নিয়ে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

যেভাবে শুরু ‘ককরোচ’ আন্দোলন 

চলতি বছরের মে মাসে ইনস্টাগ্রামভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক পেজ হিসেবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আত্মপ্রকাশ করে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার তরুণদের ‘ককরোচ’ ও ‘পরজীবী’ হিসেবে তুলনা করার পর ওই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সংগঠনটি গড়ে ওঠে। 

পরে এটি শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসসহ বিভিন্ন অভিযোগের প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের বড় জমায়েত হয় এবং একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও ঘটে। 

ব্যাংকিপুরে বিজেপির পরাজয়

আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় ৪ আগস্ট বিহারের ব্যাংকিপুর আসনের উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের পর।

প্রায় তিন দশক ধরে বিজেপির দখলে থাকা এই আসনে এবার জয় পায় প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বাধীন জন সুরাজ পার্টি। এর আগে আসনটি বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের দখলে ছিল। 

এই পরাজয় বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, আন্দোলনের সময় নিতিন নবীন জেন-জি আন্দোলনকারীদের ‘ভাইরাস’ ও ‘ককরোচ গ্যাং’ হিসেবে আক্রমণ করেছিলেন। 

অন্যদিকে, সেই আন্দোলনের পরই বিজেপির দীর্ঘদিনের দখলে থাকা আসনে দলটির পরাজয় নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। 

তরুণদের কাছে পৌঁছাতে বিজেপির নতুন চেষ্টা 

তরুণদের আন্দোলনের পর বিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা বাড়িয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করেন। দলীয় নেতাদেরও তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে রিলস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। 

উত্তর প্রদেশে তরুণদের কাছে পৌঁছাতে স্কুলে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বিজেপির পক্ষ থেকে এমন একটি ভিডিওও প্রকাশ করা হয়, যেখানে তরুণদের ব্যবহৃত ইন্টারনেটের ভাষা ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ঠাট্টার শিকার হয়। অনেকে প্রশ্ন তোলেন, তরুণদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগের বদলে বিজেপি যেন কৃত্রিমভাবে তাদের ভাষা ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ দেখাচ্ছে যে বিজেপি তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবকে এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ধরন?

বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রতিবাদের ধরনে।

আগের বিভিন্ন আন্দোলনের সময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ‘দেশবিরোধী’, ‘বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০১৯-২০ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলনের সময়ও এমন পরিস্থিতি দেখা যায়।

কিন্তু ‘ককরোচ’ আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন হয়েছে। এতে বিভিন্ন শ্রেণি ও ধর্মের তরুণদের পাশাপাশি বিজেপির ঐতিহ্যগত হিন্দু ভোটব্যাংকের তরুণদেরও অংশগ্রহণ দেখা গেছে। 

সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিল ভার্নিয়েরের মতে, এটি ছিল অনেকটাই জাতপাত ও ধর্মের সীমারেখার বাইরে থাকা একটি আন্দোলন।

উপনির্বাচনের ফল কী বলছে? 

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বিজেপি তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটি আসনে হেরে যায়। বিহারের ব্যাংকিপুর ও মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া আসনে পরাজিত হয় দলটি। তবে প্রধানমন্ত্রী মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটের মঞ্জালপুর আসনে বিজেপি সহজেই জয় পায়।

বিরোধী দলগুলো এসব পরাজয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থী আন্দোলনের সরাসরি সম্পর্ক দেখালেও বিশ্লেষকরা এ বিষয়ে সতর্ক। 

তাদের মতে, উপনির্বাচনে ভোটার সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় শুধু এই ফলাফলের ভিত্তিতে বিজেপির জনপ্রিয়তা কমে গেছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।

তবে আন্দোলনটি বিজেপির বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


আন্দোলনকারীদের দাবি আরও বড়

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের মতে, এটি শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের আন্দোলন নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা তরুণদের ক্ষোভ থেকেই এই আন্দোলনের জন্ম। 

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেত্রী অঞ্জলির মতে, গত ১২ বছরের জমে থাকা ক্ষোভ এই আন্দোলনের পেছনে কাজ করছে।

তার মতে, শুধু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে সমস্যার সমাধান হবে না। সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাতভিত্তিক রাজনীতি ও নারীবিদ্বেষী রাজনীতি বন্ধ না হলে আন্দোলনকে পূর্ণ বিজয় বলা যাবে না। 

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিক্ষোভের সময় মুসলিম ও দলিত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।

‘ককরোচ’ আন্দোলন কি নির্বাচনী রাজনীতিতে যাবে?

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করবে এমন সম্ভাবনা কম। এর অন্যতম কারণ হলো নির্বাচনী রাজনীতিতে যেতে বিপুল অর্থ, সংগঠন ও কর্মী প্রয়োজন। তরুণদের এই আন্দোলনের সেই সাংগঠনিক সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি।

বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্দোলনটি আলাদা রাজনৈতিক দল হওয়ার বদলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। শিক্ষা, চাকরি, পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিতে প্রভাব ফেলাই হতে পারে এর বড় ভূমিকা। 

বিজেপির ক্ষমতা আছে, তবে প্রশ্ন উঠছে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে 

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক আন্দোলন এখনই বিজেপির রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেনি। দলটি এখনও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো, নির্বাচনী সক্ষমতা এবং বড় রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রেখেছে। 

তবে আন্দোলনটি বিজেপির রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতায় কিছুটা আঘাত করেছে বলে মনে করছেন তারা।

বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে মোদির ভাবমূর্তিতে পরিবর্তন এসেছে। ৭৫ বছর বয়সী মোদিকে তরুণদের চোখে আগের মতো তরুণদের নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং অনেকে তাঁকে পুরোনো প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে দেখছেন।

গবেষক জিল ভার্নিয়েরের মতে, বিজেপির প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এখন শুধু ক্ষমতা ধরে রাখা নয়, বরং সেই ক্ষমতার প্রতি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা।

হিন্দুত্বের রাজনীতি কি বদলাবে? 

বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের আন্দোলনের কারণে বিজেপি তার হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনীতি থেকে সরে আসবে এমন সম্ভাবনা কম।

বরং নির্বাচন সামনে এলে ধর্মীয় পরিচয়কে আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে পারে দলটি।

তবে ‘ককরোচ’ আন্দোলন একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার বা রাজনৈতিক বার্তা দিয়েই তরুণদের কাছে পৌঁছানো আগের মতো সহজ নয়।

বিজেপির সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, ক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি কীভাবে তরুণদের আস্থা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা যাবে।

সাম্প্রতিক আন্দোলন সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে। 


সূত্র : আল-জাজিরা 

সময়ের আলো/ইউএমএইচ


  বিষয়:   ভারত  সিজেপি  ককরোচ আন্দোলন  বিজেপি  রাজনীতি 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: