ভারত–চীন সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি এলাকায় চীনা বাহিনীর বিরুদ্ধে ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ ও দখলের অভিযোগ উঠেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে জোটে থাকা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পিপলস পার্টি অব অরুণাচল প্রদেশের (পিপিএ) একটি তথ্য অনুসন্ধানকারী দল সম্প্রতি ওই এলাকা পরিদর্শন করে এসব অভিযোগ করেছে।
তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশিত চীনা অনুপ্রবেশের খবরকে ‘ভুল ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার না করে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
চীনও নতুন করে কোনো সীমান্ত উত্তেজনার কথা স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, বর্তমানে চীন–ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি ‘সাধারণভাবে স্থিতিশীল’।
কোথায় দখলের অভিযোগ?
অভিযোগের কেন্দ্র ভারতের অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম ও পাহাড়ি জেলা আপার সুবানসিরি। পিপিএর চার সদস্যের একটি দল সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে।
দলটির দাবি, তীব্র শীত, বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কারণে প্রতি বছর এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তাসিং এলাকায় ভারতীয় সেনারা নিয়মিত টহল দিতে পারে না।
অন্যদিকে, ওই সময়েও চীনা বাহিনী সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় থাকে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় অবকাঠামো ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পিপিএর ভাইস প্রেসিডেন্ট কালিং জেরাংয়ের দাবি, স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় বাহিনী শেরা-৫ নামের একটি সীমান্ত টহল পয়েন্ট ছেড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিজেদের পূর্বপুরুষদের শিকার ও চারণভূমি হারানো নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় একটি উপজাতীয় সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও গত মাসে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দিয়ে অভিযোগ করে, চীনা অনুপ্রবেশ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
ভারত কী বলছে?
ভারতীয় সেনাবাহিনী চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব খবর ‘ভুল এবং এর কোনো ভিত্তি নেই’।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য কিছুটা ভিন্ন। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, সীমান্তের বিষয়গুলোকে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে।
তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতির প্রভাব দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ওপরও পড়ে।
চীনের অবস্থান কী?
চীনও নতুন করে কোনো সংঘাত বা উত্তেজনার অভিযোগ স্বীকার করেনি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, বর্তমানে চীন–ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি মোটের ওপর স্থিতিশীল।
তিনি জানান, দুই দেশ সম্প্রতি সীমান্ত বিষয়ক বৈঠকের ৩৬তম দফা সম্পন্ন করেছে। সীমান্ত এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভারত–চীন সীমান্ত বিরোধ
ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে এই সীমান্ত বিস্তৃত।
তবে সীমান্তের বড় একটি অংশ নিয়েই দুই দেশের বিরোধ রয়েছে। এমনকি প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি কোথায় হওয়া উচিত, তা নিয়েও ভারত ও চীনের মধ্যে মতৈক্য নেই।
১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের মধ্যে সিমলা কনভেনশনের মাধ্যমে ম্যাকমোহন লাইন নির্ধারণ করা হয়। ভারত এই রেখাকে চীনের সঙ্গে নিজেদের সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
তবে চীন এই সীমারেখা মানে না। বেইজিং পুরো অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ নামে উল্লেখ করে।
১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হয়। এরপর দুই দেশ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখাকে বাস্তব নিয়ন্ত্রণের সীমা হিসেবে বিবেচনা করলেও এলএসি ঠিক কোথায়, তা নিয়ে এখনো মতবিরোধ রয়েছে।
গালওয়ান থেকে ডোকলাম, উত্তেজনা বারবার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত–চীন সীমান্তে একাধিকবার উত্তেজনা দেখা গেছে।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা ও চার চীনা সেনা নিহত হন।
সিকিমের নাকু লা এলাকাতেও ২০২০ ও ২০২১ সালে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
এ ছাড়া ২০১৭ সালে ভুটান, ভারত ও চীনের সীমান্তসংলগ্ন ডোকলাম মালভূমিতে চীনের রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে ৭৩ দিন ধরে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে অচলাবস্থা চলেছিল।
দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক বিআর দীপকের মতে, সীমান্তে ছোট কোনো ঘটনা থেকেও বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, স্থানীয় পর্যায়ের একটি ছোট সংঘর্ষও আগের মতো বড় উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।
বাণিজ্য বাড়লেও সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়
সীমান্তে উত্তেজনা থাকলেও ভারত ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বেইজিংয়ে ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
২০১৬–১৭ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৭১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে এই বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। ভারত চীন থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার তুলনায় চীনে ভারতের রপ্তানি অনেক কম।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে চীন থেকে ভারতের আমদানি ছিল প্রায় ১৩১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে চীনে ভারতের রপ্তানি ছিল মাত্র ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিও প্রভাব ফেলছে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ভারত ও চীন – দুই দেশের ওপরই চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লি ও বেইজিং নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়লেও সীমান্ত বিরোধের মূল সমস্যা এখনো সমাধান হয়নি।
মুম্বাইয়ের সোমাইয়া বিদ্যাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহেলি চট্টরাজের মতে, ভারত–চীন সম্পর্ককে এখন ‘পরিচালিত প্রতিযোগিতা’ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়তে পারে, কিন্তু তাতে দুই দেশের মৌলিক কৌশলগত বিরোধ মিটে যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলা সংস্থার বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থির মতে, ভারত ও চীন ভবিষ্যতেও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই থাকবে।
তাঁর মতে, দুই দেশের অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ পুরোপুরি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব থেকে যাবে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সীমান্তে নতুন করে দখল বা অনুপ্রবেশের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ভারত–চীনের সাম্প্রতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা আবারও বাধার মুখে পড়তে পারে।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/ইউএমএইচ