বরিশালের আগৈলঝাড়ায় বর্ষার শাপলায় কৃষকের মুখে হাসি

মোফাজ্জেল হোসাইন, বরিশাল

সারাদেশ

বর্ষার জলে থৈ থৈ বিল-ঝিল, খাল কিংবা ডুবে থাকা কৃষিজমিতে প্রাকৃতিকভাবে ফুটে থাকা শাপলাই এখন বরিশালের আগৈলঝাড়ার বহু পরিবারের জীবিকার

2026-08-19T15:11:58+00:00
2026-08-19T15:11:58+00:00
 
  বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬,
৪ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় বর্ষার শাপলায় কৃষকের মুখে হাসি
মোফাজ্জেল হোসাইন, বরিশাল
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৩:১১ পিএম 
বিল-ঝিল, খাল থেকে শাপলা তুলে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। ছবি : সময়ের আলো
বর্ষার জলে থৈ থৈ বিল-ঝিল, খাল কিংবা ডুবে থাকা কৃষিজমিতে প্রাকৃতিকভাবে ফুটে থাকা শাপলাই এখন বরিশালের আগৈলঝাড়ার বহু পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। বর্ষায় কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যখন কৃষকদের হাতে মাঠের কাজ কমে যায়, তখন বিনা পুঁজিতে বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটাচ্ছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কয়েক শতাধিক মানুষ।

ভোরের আলো ফুটতেই নৌকা নিয়ে বিলের পানিতে নামেন শাপলা সংগ্রহকারীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে ঘুরে শাপলা সংগ্রহের পর তা নিয়ে আসেন স্থানীয় পাইকারদের কাছে। পাইকাররা সেই শাপলা ভ্যানযোগে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার এবং আশপাশের উপজেলার গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করেন। কেউ কেউ আবার সরাসরি বাজারেও দোকান নিয়ে বসেন।

আগৈলঝাড়ার চেংগুটিয়া-চৌদ্দমেদা বিলসহ বিভিন্ন বিল ও জলাবদ্ধ জমিতে এখন শাপলা সংগ্রহের ধুম পড়েছে। উপজেলার রাজিহার, গৈলা, বাকাল, বাগধা ও রতপুর ইউনিয়নের মানুষ এই মৌসুমি পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

চেংগুটিয়া-চৌদ্দমেদা বিলের শাপলা সংগ্রহকারী মো. কালাম হাওলাদার জানান, বর্ষায় কৃষিজমি পানিতে ডুবে থাকায় মাঠের কোনো কাজ থাকে না। তাই ভোরে নৌকা নিয়ে বিলে চলে যান তিনি। দিনে ২০০ থেকে ৪০০ মুঠা পর্যন্ত শাপলা সংগ্রহ করতে পারেন তিনি।

স্থানীয় সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে পাইকাররা মুঠাপ্রতি প্রায় ৫ টাকায় শাপলা কিনে নেন। পরে সেগুলো ভ্যানযোগে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে খুচরা বিক্রি করেন। এতে পাইকারদের জন্যও তৈরি হয়েছে চমৎকার এক মৌসুমি আয়ের সুযোগ।

পাইকার বনজ মন্ডল বলেন, সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে প্রতি মুঠা শাপলা ৫ টাকায় কিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১০ টাকায় বিক্রি করি। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মুঠা বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে ভালোই লাভ থাকে।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, বর্ষা মৌসুমে একেকজন সংগ্রহকারী প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মুঠা শাপলা সংগ্রহ করেন। ভালো দিনে কারও কারও আয় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়। অন্যদিকে পাইকারি কেনাবেচায় যুক্তদের দৈনিক বিক্রি দাঁড়ায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বা তারও বেশি।


শাপলা সংগ্রহকারী রহমান জানান, বছরের প্রায় চার মাস তিনি এই কাজ করেন। কোনো পুঁজি লাগে না বলে বর্ষার এই শাপলা সংগ্রহই তার সংসারের বড় ভরসা। স্থানীয়ভাবে শাপলা মূলত সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ডাঁটা দিয়ে তৈরি তরকারি গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘদিনের পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে শহরাঞ্চলেও এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে বর্ষাকালে বিল ও ডোবা থেকে বিনা খরচে পাওয়া শাপলা স্থানীয় বাজারে পরিণত হয়েছে একটি অর্থকরী পণ্যে।

আষাঢ় থেকে ভাদ্র— এই তিন-চার মাস শাপলার মৌসুম। প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়ায় শাপলা উৎপাদনে কৃষকের আলাদা কোনো বিনিয়োগ বা খরচ করতে হয় না।

আগৈলঝাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনীতি কুমার সাহা বলেন, শাপলা প্রচলিত কৃষিপণ্যের আওতাভুক্ত নয়। এটি প্রাকৃতিকভাবে জলাশয়ে জন্মায় বিধায় কৃষি বিভাগের সরাসরি পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে কৃষকদের শাপলা দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বরিশাল বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে বিদেশে রফতানি করা গেলে শাপলা থেকে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। এ ছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম শাপলা লতায় ৩১ গ্রাম শর্করা, ৩ গ্রাম প্রোটিন ও ৭৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর।

আগৈলঝাড়ার বিলাঞ্চলের মানুষের কাছে বর্ষা একসময় ছিল কর্মহীনতার মৌসুম। পানিতে তলিয়ে যেত কৃষিজমি, কমে যেত মাঠের কাজ। সেই পানিই এখন অনেক পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে আয়ের উৎস। শাপলা সংগ্রহ থেকে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি— এই মৌসুমি কর্মকাণ্ডকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ছোট্ট একটি অর্থনৈতিক বলয়।

একদিকে বিল থেকে শাপলা তুলে আয় করছেন সংগ্রহকারীরা, অন্যদিকে পাইকার ও ভ্যানচালকরাও যুক্ত হচ্ছেন এর বিপণনে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা এই প্রাকৃতিক সম্পদকে স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। জাতীয় ফুল শাপলা তাই আগৈলঝাড়ার মানুষের কাছে শুধু বর্ষার সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; বরং বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বহু পরিবারের সংসার চালানোর নীরব অবলম্বন।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   বরিশাল  আগৈলঝাড়ায  বর্ষা  শাপলা  কৃষক  মুখে হাসি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: