নবীপ্রেম শুধু আবেগ নয়, অনুসরণের নাম

আমীনুর রহমান নড়াইলী

ইসলাম

মানুষ যাকে ভালোবাসে, স্বাভাবিকভাবেই তার কথা মনে রাখে, তার পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দেয় এবং তার দেখানো পথে চলতে চেষ্টা করে। ভালোবাসা

2026-08-21T21:45:14+00:00
2026-08-21T22:54:22+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ইসলাম
নবীপ্রেম শুধু আবেগ নয়, অনুসরণের নাম
আমীনুর রহমান নড়াইলী
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৪৫ পিএম  আপডেট: ২১.০৮.২০২৬ ১০:৫৪ পিএম
নবীপ্রেম শুধু আবেগ নয়, অনুসরণের নাম
মানুষ যাকে ভালোবাসে, স্বাভাবিকভাবেই তার কথা মনে রাখে, তার পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দেয় এবং তার দেখানো পথে চলতে চেষ্টা করে। ভালোবাসা শুধু মুখের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ভালোবাসার প্রভাব মানুষের আচরণ ও জীবনযাপনে ফুটে ওঠে। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসার দাবিও কেবল আবেগ, স্লোগান কিংবা কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নবীপ্রেমের প্রকৃত পরিচয় হলো তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসা, তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণ করা এবং তাঁর দেখানো পথে চলা।

রবিউল আউয়াল আমাদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস। এ মাসে আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন, তাঁর মহান চরিত্র, দাওয়াত, ত্যাগ ও উম্মতের প্রতি ভালোবাসার কথা বেশি বেশি স্মরণ করি। কিন্তু এই স্মরণ তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা আমাদের জীবনে পরিবর্তনের সূচনা করবে। নবীজি (সা.)-এর জীবন সম্পর্কে আলোচনা হবে, তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা হবে, তাঁর ভালোবাসার কথা বলা হবে, কিন্তু যদি তাঁর সুন্নাহ আমাদের ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও সমাজজীবনে প্রতিফলিত না হয়, তা হলে আমাদের নবীপ্রেমের দাবিকে নতুন করে যাচাই করা প্রয়োজন।

ভালোবাসার প্রমাণ অনুসরণ

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন’ (সুরা আলে ইমরান : ৩১)। এই আয়াত নবীপ্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহর ভালোবাসার দাবির প্রমাণ যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ, তেমনি রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার দাবির বাস্তব প্রমাণও তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা। 

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু তাঁর কথা ও নির্দেশকে জীবনের বাইরে রাখা হবে, এটি ভালোবাসার পূর্ণাঙ্গ রূপ নয়। তিনি আমাদের শুধু কিছু ইবাদতের নিয়ম শেখাননি; বরং কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে প্রতিবেশীর সঙ্গে আচরণ করতে হবে, কীভাবে পরিবার পরিচালনা করতে হবে, কীভাবে ব্যবসা করতে হবে, কীভাবে দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, জীবনের অসংখ্য ক্ষেত্রে তিনি আমাদের জন্য আদর্শ রেখে গেছেন।

তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের আদর্শ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর মহান চরিত্র। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী’ (সুরা আল-কলম : ৪)। তিনি মানুষের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন, ক্ষমা করতেন, অসহায়ের পাশে দাঁড়াতেন এবং মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্টের মতো অনুভব করতেন। 

আজ আমরা নবীপ্রেমের কথা বলি; অথচ আমাদের কথায় মিথ্যা, আচরণে রূঢ়তা, লেনদেনে প্রতারণা, পরিবারে অন্যায় কিংবা মানুষের প্রতি যদি অহংকার থাকে, তা হলে আমাদের নবীপ্রেমের দাবি কতটা বাস্তব তা ভেবে দেখা দরকার। নবীজি (সা.)-এর ভালোবাসা আমাদের চরিত্রে ফুটে উঠবে, এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যাশা।

ইবাদতে সুন্নাহর অনুসরণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের নামাজ শিখিয়েছেন, রোজা শিখিয়েছেন, দোয়া ও জিকির শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখেছ, সেভাবেই নামাজ পড়ো’ (বুখারি)। তাই নবীপ্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো তাঁর ইবাদতের পদ্ধতি সম্পর্কে জানা এবং যথাসাধ্য তা অনুসরণ করা। নামাজে আমরা তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করব, দোয়ায় তাঁর শেখানো দোয়া পড়ব, রোজায় তাঁর নির্দেশনা মেনে চলব। শুধু বিশেষ কোনো মাসে নয়, সারা বছরই তাঁর সুন্নাহকে জীবনের অংশ করে নিতে হবে।


পরিবারে নবীজি (সা.)-এর আদর্শ

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী, পিতা ও পরিবারের সদস্য। তাঁর পরিবারে ছিল ভালোবাসা, কোমলতা, দায়িত্ববোধ ও সুন্দর আচরণ। আজ অনেক মানুষ মসজিদে অত্যন্ত বিনয়ী, কিন্তু ঘরে এসে রূঢ়। বাইরে সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেন, অথচ স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অথচ নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম’ (তিরমিজি)। সুতরাং নবীপ্রেমের দাবি হলো, ঘরের মানুষ যেন আমাদের কাছ থেকে নবীজি (সা.)-এর চরিত্রের সৌন্দর্য অনুভব করতে পারে।

ব্যবসা ও লেনদেনেও নবীজি (সা.)-এর আদর্শ

ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে না। ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনেও রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের আদর্শ। সততা, আমানতদারি, সঠিক ওজন, প্রতারণামুক্ত লেনদেন— এসব ছিল তাঁর শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

তিনি বলেছেন, ‘যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (মুসলিম)। অতএব একজন ব্যবসায়ী যদি নবীপ্রেমিক হতে চান, তা হলে তার দোকানে সেই ভালোবাসার প্রমাণ থাকতে হবে। পণ্যের ত্রুটি গোপন না করা, ক্রেতাকে ঠকানো থেকে বিরত থাকা, মিথ্যা প্রচার না করা— এসবও নবীপ্রেমের বাস্তব প্রকাশ।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবতার জন্য রহমত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি আপনাকে পুরো বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি’ (সুরা আল-আম্বিয়া : ১০৭)। 

তিনি এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও দুর্বল মানুষের প্রতি বিশেষ যত্নশীল ছিলেন। প্রতিবেশীর অধিকার, আত্মীয়তার সম্পর্ক, মুসাফিরের হক সবকিছুর ব্যাপারে তিনি উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন। তাই নবীপ্রেম আমাদের হৃদয়কে মানুষের প্রতি আরও দয়ালু করবে। কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসুস্থের খোঁজ নেওয়া, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা— এসব কাজও তাঁর আদর্শ অনুসরণের অংশ।

নবীপ্রেম কি শুধু বিশেষ মাসে?

রবিউল আউয়াল এলে নবীজি (সা.)-এর আলোচনা বাড়বে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর প্রতি ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত নয়। রবিউল আউয়াল আমাদের মনে করিয়ে দিক— আমরা সারা বছর নবীজি (সা.)-এর জীবন পড়ব, তাঁর সুন্নাহ শিখব, তাঁর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করব এবং নিজের জীবনে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। শুধু একটি মাসে নবীপ্রেমের কথা বলে বাকি এগারো মাস তাঁর সুন্নাহ থেকে দূরে থাকা আমাদের লক্ষ্য হতে পারে না। বরং এই মাস হোক আত্মসমালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারের মাস।

ভালোবাসা হোক পরিবর্তনের শক্তি

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে শুধু ভালোবাসতেন না, তাঁরা তাঁর নির্দেশকে জীবনের নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করতেন। তাঁর একটি কথা তাঁদের জীবন পরিবর্তন করে দিত। তাঁর সুন্নাহ তাঁদের কাছে ছিল অনুসরণীয় আদর্শ। আমাদেরও প্রশ্ন করা উচিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি আমার ভালোবাসা আমার জীবনে কতটা পরিবর্তন এনেছে? এ প্রশ্নের উত্তরই আমাদের নবীপ্রেমের বাস্তব চিত্র তুলে ধরবে।


নবীপ্রেমের অঙ্গীকার

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা একজন মুমিনের ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ না থাকে। তাঁর নাম শুনলে হৃদয় নরম হবে, তাঁর ওপর দরুদ পাঠে জিহ্বা সিক্ত হবে, তাঁর জীবন পড়ে চোখে পানি আসবে, এর পাশাপাশি তাঁর সুন্নাহ আমাদের জীবনের পথনির্দেশ হয়ে উঠবে। 

রবিউল আউয়ালে আমরা নতুন করে অঙ্গীকার করতে পারি, নবীজি (সা.)-এর জীবন জানব, তাঁর সুন্নাহ শিখব, পরিবার ও সমাজে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করব এবং নিজের চরিত্রকে তাঁর চরিত্রের আলোয় আলোকিত করার চেষ্টা করব। কারণ নবীপ্রেম শুধু তাঁকে স্মরণ করার নাম নয়, নবীপ্রেম হলো তাঁকে অনুসরণ করার নাম। ভালোবাসা শুধু মুখে উচ্চারিত হবে না; তা আমাদের নামাজে, চরিত্রে, কথায়, কাজে, পরিবারে, ব্যবসায় এবং মানুষের সঙ্গে আচরণে প্রকাশ পাবে।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   নবীপ্রেম  আবেগ  অনুসরণ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: