রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তখন পৃথিবীজুড়ে একটা চরম হাহাকার বিরাজ করছিল। চারদিকে তাকালে বিভীষিকাময় একটা চিত্র চোখে পড়ত। বর্বরতা, বীভৎসতা আর অমানবিকতায় ভরপুর ছিল সে চিত্র। সেখানে জ্ঞানের আলো ছিল না। নৈতিকতার সুরভি ছিল না। সভ্যতার সৌন্দর্য ছিল না। ছিল না প্রেম ও পুণ্যের কোনো পবিত্রতা। একটা দুঃসহ যন্ত্রণায় লাগাতার পিষ্ট হচ্ছিল মানুষের পৃথিবী।
ওই সময় পৃথিবীতে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, মানুষ আল্লাহকে ভুলে থাকলে ভীষণ দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে। গুনাহের প্রতি দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। বস্তুর প্রতি ভরসায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। কোনো কাজের জন্য তার ভেতরে জবাবদিহির ভয় থাকে না। দুনিয়াটা তার জন্য স্রেফ ভোগের রঙ্গমঞ্চে পরিণত হয়। আর সে হয়ে পড়ে প্রবৃত্তির গোলাম।
মানুষের জন্য শিরক হচ্ছে চরম লাঞ্ছনাকর এক পাপ। কারণ একজন মুশরিক তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর জিনিসের সামনেও সেজদাবনত হতে দ্বিধাবোধ করে না। সে স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টির কাছে বেশি প্রত্যাশা রাখে। সে কখনোই সুস্থির হতে পারে। মামুলি জিনিসের ভয়ও তাকে তটস্থ করে রাখে।
অপরদিকে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস মানুষকে মহিমান্বিত করে তোলে। আল্লাহ ছাড়া আর কারও সামনে সে সেজদাবনত হয় না। আর কারও ভয় তাকে তটস্থ করে না। অন্য কারও ভালোবাসায় সে ব্যাকুল হয় না। এ বিশ্বাস তাকে কল্পনার ধোঁয়াশা থেকে বাস্তবতার পাটাতনে এনে দাঁড় করায়। সে বুঝতে পারে, ভালো-মন্দের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে।
জগতের সবকিছু মিলেও আল্লাহর সে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। এর ফলে দুনিয়া তার কাছে স্রেফ ভোগের রঙ্গমঞ্চ মনে হয় না, বরং মনে হয় পরীক্ষার জায়গা। এই মনোজাগতিক শুদ্ধতা আল্লাহ তায়ালার অনেক বড় নেয়ামত। বিশাল বড় রহমত।
নবীজি (সা.)-এর বদৌলতে মানুষ এ রহমত লাভ করেছে। নবীজি (সা.)-এর আগেও সব আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম তাওহিদের প্রচার করে গেছেন। বরেণ্য অনেক মনীষী শিরকের বিরোধিতা করেছেন। নুহ (আ.) থেকে নিয়ে নবীজি (সা.)-এর আবির্ভাবের আগপর্যন্ত জগৎজুড়ে শিরকি চেতনার আধিপত্য ছিল। সর্বশেষ রাসুল (সা.) তাওহিদের চেতনাকে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে বিজয়ী করে গেছেন। ফলে কেয়ামত পর্যন্ত নিঃসন্দেহে তা বিজয়ী চেতনারূপেই প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
নবীজি (সা.)-এর আবির্ভাবের আগে বলতে গেলে পৃথিবীর সব সভ্যতা ও ধর্মে মানুষে মানুষে চরম বৈষম্য ছিল। কিছু মানুষকে জন্মগতভাবে পূজ্য আর কিছু মানুষকে সৃষ্টিগতভাবে তুচ্ছ জ্ঞান করা হতো। ইহুদিরা ইসরাইলি এবং অইসরাইলি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। নবী ইয়াকুবের উত্তরসূরিদের তারা অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করত। পারসিকরা মনে করত, যারা রাজবংশের লোক তারা জগতে প্রভুর প্রতিনিধি। হিন্দুস্তানের অবস্থা ছিল চরম শোচনীয়।
এখানে মানুষকে চার স্তরে ভাগ করা হয়েছিল। মনে করা হতো, ঈশ্বরের মস্তক থেকে ব্রাহ্মণরা জন্ম নিয়েছে। তাই তারা জ্ঞান বিতরণ ও পূজা-পার্বণ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। ক্ষত্রিয়দের জন্ম ঈশ্বরের বাহু থেকে। তারা রাষ্ট্রশাসন, রাজ্যরক্ষা এবং প্রজাদের নিরাপত্তা বিধানের বিষয়গুলো দেখভাল করবে। বৈশ্যদের জন্ম হয়েছে ঈশ্বরের ঊরু থেকে।
তারা কৃষি, গবাদিপশুপালন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম আঞ্জাম দেবে। আর শূদ্ররা জন্মেছে ঈশ্বরের পদযুগল থেকে। এ জন্য তারা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিন বর্ণের লোকদের পরিচর্যা ও সেবা করবে। এভাবে জাতিগত বৈষম্যের মাধ্যমে শূদ্রদের চরম লাঞ্ছিত ও অবহেলিত করে রাখা হয়েছিল। তাদের জন্য জ্ঞানার্জনের কোনো সুযোগ ছিল না। সমাজের যত নীচতর কাজ তাদের করতে হতো। পৃথিবীর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মাঝেও কমবেশি এমন বৈষম্য বিরাজ করছিল।
রাসুল (সা.) মানুষের মধ্যকার এই জুলুমাত্মক বৈষম্যকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেন। জন্মগতভাবে আশরাফ বা আতরাফ হওয়ার মানসিকতা তিনি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ঘোষণা করেন, একজন অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শেতাঙ্গ কেবল বর্ণ বা বংশের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব পাবে না। শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি শুধু তাকওয়া ও আমল।
এই বৈপ্লবিক ঘোষণার ফলে ইসলাম যেখানে পা রেখেছে, বৈষম্য ও বিভেদের প্রাচীর সেখানে ধসে পড়েছে। সেখানে মানবিক সাম্যের জয়গান উচ্চকিত হয়েছে। সামাজিক জীবনে প্রত্যেকে সসম্মানে জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে, রাজ্যশাসনের অধিকারের ক্ষেত্রে। আগে যেখানে এই অধিকার গুটিকয়েক বংশ ও পরিবারের হাতে কুক্ষিগত ছিল। ইসলাম সেখানে জগতের প্রতিটি মানুষের মাঝে এই অধিকার লাভের সম্ভাবনা আছে বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আজও পৃথিবীর কোনো প্রান্তে কেউ ক্ষমতা ও বর্বরতার প্রশ্রয়ে এই বৈষম্য ধরে রাখতে গেলে তাকে তুমুল প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অবহেলিত জনগোষ্ঠী নিজেদের অধিকার বুঝে পাওয়ার জন্য দাবি করতে পারছে। নিঃসন্দেহে এটা জগদ্বাসীর জন্য নবীজি (সা.)-এর বদৌলতে পাওয়া অপার রহমত।
নবী (সা.) যে সমাজে জন্মগ্রহণ করেন, সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পড়ালেখা জানত না। পড়ালেখা তাদের কাছে একটা উৎকট ঝামেলা মনে হতো। এই স্রোতের বিপরীতে উজান বেয়ে রাসুল (সা.) জ্ঞানার্জনের প্রতি বিপুল উৎসাহ প্রদান করেন। সমাজের সর্বশ্রেণির মানুষের জন্য জ্ঞানের দরজা উন্মোচিত করে দেন। জ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি দ্বীন ও দুনিয়ার কোনো বিভাজন তৈরি করেননি। যে জ্ঞান মানুষের জন্য কল্যাণকর তার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। তিনি বলেছেন, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হচ্ছে মানুষের হারানো সম্পদ।
যেখানেই তার সন্ধান পাওয়া যাবে, দুহাত ভরে তা তুলে নিতে হবে। তিনি প্রয়োজনে ইহুদিদের শিক্ষালয় ‘বায়তুল মিদরাসে’ও গমন করেছেন।
ইসলামপূর্ব সময়ে সমাজে নানা কুসংস্কার আর অলীক কল্পবিশ্বাসের ছড়াছড়ি ছিল। এই সমস্যা শুধু আরবে নয়, বিশ্বজুড়েই প্রকটভাবে বিরাজ করছিল। রাসুল (সা.) যাবতীয় কল্পবিশ্বাস আর কুসংস্কার দূর করতে আপসহীন ভূমিকা রাখেন।
তিনি একটা মৌলিক কথা বলে দেন, কল্যাণ বা অকল্যাণ সাধনের ক্ষমতা কোনো সৃষ্টির হাতে নেই। এর পুরোটাই আল্লাহর হাতে। যেসব জিনিসে অকল্যাণ আছে বলে মানুষ ধারণা করত, সেগুলোকে তিনি ধরে ধরে অপনোদন করেন। ফলে মানুষ কুসংস্কারের মায়াজাল ছিঁড়ে ফেলতে সক্ষম হয়।
জ্ঞান ও বাস্তবতার অবারিত জগৎ তাদের সামনে আসে। তাদের অনুসন্ধিৎসু মানসিকতা জোরালো হয়। নতুন নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে জগৎ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। বলতে দ্বিধা নেই, এটা জগদ্বাসীর ওপর নবীজি (সা.)-এর অপরিসীম রহমতের বরকত।
ইসলাম আগমনের আগে ধার্মিক লোকেরাই দ্বীন ও দুনিয়ার মাঝে বিস্তর বিভাজন তৈরি করে রেখেছিল। এই বিভাজন জগতের সহজাত স্বভাবকে বিনষ্ট করে ফেলেছিল। মানুষ বিয়েশাদিকে খারাপ চোখে দেখত। খোদার নৈকট্য লাভের জন্য বৈরাগ্যের পথ বেছে নিত।
নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্ক বাঁকা চোখে দেখা হতো। জীবিকা নির্বাহের জন্য পরিশ্রমকে সুনজরে দেখা হতো না। কিছু মানুষ গোসল করা, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকা, সুগন্ধি ব্যবহার করা; ইত্যাদি রুচিসম্পন্ন কাজগুলোকে ধর্মবিরোধী মনে করত। ফলে বছরকে বছর তারা গোসল করত না।
রাসুল (সা.) বৈরাগ্যবাদের এই ধারণাকে প্রচণ্ডভাবে রদ করেছেন। তিনি শিখিয়ে গেছেন, আল্লাহর বিধানের ভেতরে থেকে জাগতিক কল্যাণ ভোগ করাও দ্বীনের অংশ। দুনিয়া বর্জন করার নাম দ্বীন নয়। দ্বীন হচ্ছে হালাল-হারামের বাছবিচার করে দুনিয়া ভোগ করা। তিনি মানুষের জন্য এমন কোনো বিধান দেননি যা মানব স্বভাবের সঙ্গে যায় না। কাজেই তা মানবজাতির জন্য অনিঃশেষ রহমতের ফোয়ারা।
রাসুল (সা.) বিভীষিকাময় এই জগতে সাম্য, সভ্যতা, ইনসাফ ও মানবতার মশাল প্রজ্বালন করেছেন। যার আলোক শিখা আজও পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত পথ দেখাচ্ছে। রহমতের এই আলোকধারা বয়ে চলবে অনন্তকাল ধরে। ‘নিখিল বিশ্বের রহমত তুমি’ শাশ্বত এই ঘোষণা অম্লানরূপে উদ্ভাসিত থাকবে সময়ের বাঁকে বাঁকে।
সময়ের আলো/এসএকে