নবীজীবনের অলৌকিক ঘটনা

মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি

ইসলাম

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নবী-রাসুলের মাধ্যমে প্রকাশিত এমন অসাধারণ ঘটনা, যা সাধারণ মানবীয় ক্ষমতার ঊর্ধ্বে এবং যার অনুরূপ কিছু করার

2026-08-21T21:59:26+00:00
2026-08-21T21:59:26+00:00
 
  শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬,
৬ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
নবীজীবনের অলৌকিক ঘটনা
মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নবী-রাসুলের মাধ্যমে প্রকাশিত এমন অসাধারণ ঘটনা, যা সাধারণ মানবীয় ক্ষমতার ঊর্ধ্বে এবং যার অনুরূপ কিছু করার ক্ষেত্রে মানুষ অক্ষম— সেগুলো বলা হয় ‘মুজেজা’। মুজেজার প্রকৃত ক্ষমতার উৎস একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। নবী-রাসুলগণ আল্লাহর প্রদত্ত ক্ষমতায় মুজেজা প্রকাশ করেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আপনি যখন নিক্ষেপ করেছিলেন, তখন আপনি নিক্ষেপ করেননি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ১৭)। 

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, কোনো মুজেজা নবীর মোবারক হাতের মাধ্যমে প্রকাশ পেলেও তার প্রকৃত স্রষ্টা ও ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। নবীজির মুজেজার সংখ্যা অসংখ্য। তাঁর পবিত্র জীবনে এমন বহু অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যেগুলো তাঁর নবুয়তের সত্যতা, আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ মর্যাদা এবং উম্মতের প্রতি তাঁর অসীম রহমতের সাক্ষ্য বহন করে।

স্মরণশক্তি ফিরে পেলেন সাহাবি

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) ছিলেন নবীজির অন্যতম ঘনিষ্ঠ সাহাবি এবং সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবিদের একজন। তিনি প্রচুর হাদিস শুনতেন; কিন্তু সেগুলো স্মরণে রাখা নিয়ে তাঁর আশঙ্কা ছিল। তিনি নবীজির কাছে বিষয়টি তুলে ধরলে নবীজি তাঁকে চাদর বিছাতে বলেন। 

এরপর তিনি চাদরটি শরীরে জড়িয়ে নিতে বলেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, এরপর তিনি আর কোনো হাদিস ভুলে যাননি। সহিহ বুখারির বর্ণনায় তাঁর ভাষায়, ‘এরপর আমি আর কিছুই ভুলিনি’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৯)। 

নবীজির দোয়া ও বরকতের ফলে হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর স্মরণশক্তিতে যে অসাধারণ পরিবর্তন ঘটেছিল, তা তাঁর জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা।

দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেন অন্ধ সাহাবি

নবীজির কাছে এক দৃষ্টিহীন ব্যক্তি এসে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য দোয়া করতে অনুরোধ করেন। নবীজি তাঁকে ওজু করে একটি বিশেষ দোয়া শিক্ষা দেন। সেই দোয়ায় তিনি নবীজিকে আল্লাহর রহমতের নবী হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এবং নবীজির শাফায়াত কবুলের আবেদন করেন (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৭৮)। 

এ হাদিসে নবীজির দোয়া, শাফায়াত ও উসিলার গুরুত্বও প্রতিফলিত হয়েছে। একই সঙ্গে এটি তাঁর দোয়ার বরকত ও আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

দোয়ার বরকতে বৃষ্টি

নবীজির দোয়ার মাধ্যমে বৃষ্টি নাজিল হওয়ার ঘটনা সহিহ হাদিসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, এক জুমার দিন রাসুলুল্লাহ খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বললেন, অনাবৃষ্টির কারণে মানুষ বিপদে পড়েছে; আপনি আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য দোয়া করুন। নবীজি দোয়া করলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই বৃষ্টি শুরু হলো এবং একটানা কয়েক দিন বর্ষণ হতে থাকল। 

পরবর্তী জুমায় অতিবৃষ্টির কারণে একই সাহাবি অথবা অন্য একজন বৃষ্টি বন্ধের জন্য দোয়া করতে বললে নবীজি দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমাদের আশপাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়।’ হজরত আনাস (রা.) বলেন, মেঘগুলো মদিনার চারপাশে সরে গেল এবং মদিনার ওপর থেকে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০১৫)।


অল্প খাদ্যে বহু মানুষের তৃপ্তি

নবীজির মুজেজার মধ্যে অল্প খাদ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের তৃপ্ত হওয়ার ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গাজওয়ায়ে খন্দকের সময় হজরত জাবির (রা.) অল্প খাবারের আয়োজন করেছিলেন। নবীজি সেখানে উপস্থিত হয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে খাবারে বরকত দেন। এরপর বিপুলসংখ্যক সাহাবি সেই খাবার গ্রহণ করেন। এ ঘটনা সহিহ বুখারিতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪১০১)।

আঙুল থেকে পানি প্রবাহিত

নবীজির আরেকটি প্রসিদ্ধ মুজেজা হলো তাঁর আঙুল মোবারকের মধ্য থেকে পানির প্রবাহ সৃষ্টি হওয়া। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, একসময় সাহাবায়ে কেরামের কাছে পর্যাপ্ত পানি ছিল না। তখন নবীজি একটি পাত্রে তাঁর হাত রাখলে তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে পানির প্রবাহ বের হতে থাকে। সাহাবায়ে কেরাম সেই পানি থেকে পান করেন এবং ওজু করেন (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৫৭৬)। নবীজির এই মুজেজা আল্লাহ তায়ালার অসীম কুদরতের এক বিস্ময়কর প্রকাশ।

চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার মুজেজা

নবীজির অন্যতম প্রসিদ্ধ মুজেজা হলো চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘কেয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে’ (সুরা কামার, আয়াত : ১)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-সহ একাধিক সাহাবি থেকে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৮৬৪)। এ ঘটনা নবীজির নবুয়তের অন্যতম প্রসিদ্ধ মুজেজা হিসেবে মুসলিম ঐতিহ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত।

ইসরা ও মিরাজের অনন্য মুজেজা

নবীজির সবচেয়ে মহান মুজেজাগুলোর অন্যতম হলো ইসরা ও মেরাজ। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছেন’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১)। 

সহিহ হাদিসে মেরাজের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। নবীজি আসমানগুলোয় আরোহণ করেন, বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং মহান আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪৯)।


মুজেজার শিক্ষা

নবীজির মুজেজাগুলো শুধু বিস্ময় সৃষ্টি করার জন্য ছিল না; বরং এগুলোর মধ্যে রয়েছে ঈমান ও আকিদার গভীর শিক্ষা। এগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবীকে অসাধারণ মর্যাদা দিয়েছেন এবং তাঁর হাতে এমন সব নিদর্শন প্রকাশ করেছেন, যা সাধারণ মানবীয় ক্ষমতার ঊর্ধ্বে। 

তাই মুজেজার ঘটনা শুনে শুধু বিস্মিত হওয়া নয়; বরং নবীজির প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করা, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর আদর্শে জীবন গঠন করাই আমাদের মূল দায়িত্ব।

লেখক : প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম

সময়ের আলো/এসএকে



  বিষয়:   নবীজীবন  অলৌকিক  ঘটনা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: