মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় ও মনোনীত বান্দা। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সব নবী ও রাসুলের ওপর সর্বোচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। মানবজাতির হেদায়েতের জন্য তাঁর এই ধরায় আগমন ছিল এক ঐতিহাসিক ও মহিমান্বিত ঘটনা।
ঐতিহাসিকদের মতে, আনুমানিক ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল, সোমবার সুবহে সাদিকের সময় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মতারিখ নিয়ে কিছু মতভেদ থাকলেও সোমবার দিনটি নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
স্বয়ং রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, এটি সেই দিন, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করি এবং এই দিনে আমার ওপর কুরআন অবতীর্ণ হয় (সহিহ মুসলিম : ১১৬২)। তাঁর জন্মলগ্নে বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল, যাকে সিরাত সাহিত্যে ‘ইরহাসাত’ বা নবুয়তের পূর্বলক্ষণ বলা হয়।
পবিত্র এই জন্মলগ্নের প্রধান ও উল্লেখযোগ্য অলৌকিক ঘটনাবলির মধ্যে পারস্যের সম্রাট কিসরার রাজপ্রাসাদ কেঁপে ওঠার ঘটনাটি অন্যতম, যার ফলে এর চৌদ্দটি প্রকাণ্ড চূড়া ভেঙে পড়েছিল। একই রাতে পারস্যের অগ্নি উপাসকদের পবিত্র আগুন, যা হাজার বছর ধরে অবিরাম প্রজ্বলিত ছিল, অলৌকিকভাবে নিভে যায়।
এ ছাড়া সাওয়া নামক সুপরিচিত নদের প্রবাহিত পানি হঠাৎ শুকিয়ে যায় এবং কাবাঘর ও তার আশপাশের চত্বরে স্থাপিত কাফেরদের সব মূর্তি মাথা নিচু করে বা উপুড় হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, বিশ্বনবীর জন্মের কিছুদিন আগেই হস্তিবাহিনীর করুণ বিনাশ ঘটে।
আবরাহার এই বিশাল বাহিনী আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা শরিফ ধ্বংস করতে এসেছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা আবাবিল পাখির মাধ্যমে কংকর বর্ষণ করে তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস ও পর্যুদস্ত করেন। সীরাতের কিতাবগুলোতে এসেছে যে, এই ঘটনাটি ছিল মূলত বিশ্বনবীর পবিত্র আগমনের বরকতময় সূচনার এক বড় বহিঃপ্রকাশ।
নবীজির জন্মসংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করেছেন হজরত আয়েশা (রা.)। তিনি জানান, রাসুল (সা.)-এর জন্মের রাতে মক্কা নগরীতে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বসবাসকারী এক ইহুদি কুরাইশদের কাছে গিয়ে জানতে চাইল যে, গত রাতে এই জনপদে কোনো শিশুর জন্ম হয়েছে কি না।
কুরাইশরা বিষয়টি অস্বীকার করলে সে অনুসন্ধান করার তাগিদ দিয়ে বলল, আজ রাতে শেষ জমানার নবী ভূমিষ্ঠ হয়েছেন, যাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে মোহরে নবুয়ত বা নবুয়তের সিলমোহর রয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র আব্দুল্লাহর ঘরে একটি পুত্রসন্তান জন্ম নিয়েছে।
ইহুদি লোকটি শিশুটিকে দেখার পর যখন তার কাঁধে মোহরে নবুয়তের নিদর্শন দেখতে পেল, তখন সে চিৎকার করে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যায়। জ্ঞান ফেরার পর সে আক্ষেপ করে বলে ওঠে, ‘আজ থেকে বনি ইসরাইলের নবুয়ত সমাপ্ত হলো।’
এ ছাড়া উম্মুল মুমিনিন হজরত আমেনা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসুল (সা.)-কে গর্ভে ধারণ করার সময় তিনি অন্য সাধারণ নারীদের মতো কোনো কষ্ট বা ভারবোধ অনুভব করেননি। তাঁর পবিত্র শরীর থেকে এমন এক বিশেষ নূর বা আলোর দ্যুতি প্রকাশিত হয়েছিল, যার আলোয় সিরিয়া বা শামের প্রাসাদগুলো পর্যন্ত আলোকিত হয়ে উঠেছিল।
একই সঙ্গে আকাশমণ্ডলীতে শয়তান ও জিনদের আসমানের সংবাদ শোনার পথ চিরতরে বন্ধ করতে উল্কাপাত বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব অলৌকিক ও অসাধারণ নিদর্শন বিশ্ববাসীর কাছে মহানবী (সা.)-এর সুমহান আগমনের শুভবার্তা ও তাঁর চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠত্বের কথাই ঘোষণা করেছিল।
লেখক : প্রাবন্ধিক, দোহা, কাতার
সময়ের আলো/কেএইচও