পুরুষ ও নারী একে অপরের পরিপূরক। পুরুষের আশ্রয় ছাড়া যেমন নারীর জীবন কঠিন, তেমনি নারীর সহায়তা ছাড়া চলতে পারে না পুরুষ। নারী-পুরুষের এই যৌথ প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা হয় পরিবারের মাধ্যমে।
মহান আল্লাহ উভয়ের জীবনের চাহিদা পূরণের ব্যবস্থাপনা করেছেন বিয়ের পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে দুজন নারী-পুরুষ দাম্পত্য জীবনের সূচনা করেন। দাম্পত্য জীবনের সুখ-শান্তি নির্ভর করে পারস্পরিক দায়িত্ব সচেনতার ওপর। আল্লাহ তায়ালা স্বামী ও স্ত্রীর কিছু দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছেন। প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকলে দাম্পত্য জীবন ভরে উঠবে নান্দনিকতায়। কুরআন-হাদিসের আলোকে পারস্পরিক দায়িত্বের কথা আলোচনা করা হলো।
অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা করা
স্বামীর ওপর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর খাদ্য, বাসস্থান ও পোশাকের ব্যবস্থা করা। বাসস্থান হিসেবে অন্তত একটি কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া, যেখানে স্ত্রী স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারে।
যেখানে অন্য কেউ তার অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করতে পারবে না। তদ্রুপ স্ত্রীকে প্রয়োজন পরিমাণ পোশাক ও খাবারের ব্যবস্থা করাও স্বামীর দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সন্তানের পিতার ওপর সন্তানের মায়ের জন্য অন্ন-বস্ত্রের উত্তম ব্যবস্থা করা একান্ত দায়িত্ব’ (সুরা বাকারা : ২৩৩)। অন্য আয়াতে এসেছে, ‘তোমরা স্ত্রীদের জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের ঘরে বাসস্থানের ব্যবস্থা করো।’ (সুরা তালাক : ৬)
ঘরে সম্পদের হেফাজত করা
স্ত্রীর ওপর দায়িত্ব হলো ঘরের সম্পদের হেফাজত করা এবং সন্তানদের লালন-পালন করা। মৌলিকভাবে স্ত্রীর সবচেয়ে বড়
দায়িত্ব এটি। রান্নাবান্না করা বা সংসারের অন্যান্য কাজ যদিও মৌলিকভাবে স্ত্রীর দায়িত্ব নয়, কিন্তু স্বামীর সহযোগিতা হিসেবে এবং পরকালীন কল্যাণের আশায় তা করা উত্তম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নারীরা তাদের স্বামীর ঘর ও সন্তানের দায়িত্বশীল। তাকে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (বুখারি : ২৫৫৪)।
নবীজি (সা.) হজরত ফাতেমা ও হজরত আলি (রা.)-এর মধ্যে কাজ বণ্টন করে দিয়ে বলেছিলেন, আলি বাইরের কাজ করবে এবং ফাতেমা ঘরের কাজ করবে।
শৃঙ্খলাবোধ রক্ষা করা
যেকোনো বিষয়ে শৃঙ্খলা রক্ষা করা জরুরি। শৃঙ্খলা ব্যতীত কোনো কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় না; রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার কোনোটাই সুন্দরভাবে পরিচালিত হয় না। তাই পরিবারে শৃঙ্খলাবোধ ও মান্যতা অতি জরুরি। প্রয়োজন একজনের কর্তৃত্ব ও অন্যদের অধীনতা। আল্লাহ তায়ালা স্বামীকে দিয়েছেন সেই কর্তৃত্ব।
স্ত্রী ও সন্তানদের করেছেন তার অধীন। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল। এ জন্য যে, আল্লাহ একের ওপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে’ (সুরা নিসা : ৩৪)।
এই আয়াতে একদিকে পারিবারিক শৃঙ্খলার কথা বলা হয়েছে যে, পুরুষ পরিবারে কর্তৃত্ববান এবং নারী তার অধীন; অপরদিকে পুরুষের দায়িত্বের কথাও বলে দেওয়া হয়েছে যে, সে নিজের উপার্জন পরিবারের জন্য খরচ করবে। সুতরাং স্ত্রীর দায়িত্ব হলো স্বামীকে কর্তৃত্ববান হিসেবে গ্রহণ করা এবং পুরুষের দায়িত্ব হলো স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়া।
পারস্পরিক প্রশান্তি নিশ্চিত করা
স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরকে প্রশান্তি দান করা জরুরি। এটা উভয়ের পক্ষ থেকেই হতে হবে। সারা দিনের কর্মক্লান্ত দেহে যখন স্বামী ঘরে প্রবেশ করে তখন মুচকি হাসিতে তাকে স্বাগত জানানো। স্ত্রীর মুখের মিষ্টি-মধুর হাসি রাজ্যের ক্লান্তি দূর করে দেয় নিমিষেই। দেহমনে ছড়িয়ে দেয় প্রশান্তি। এটা মহান আল্লাহর সৃষ্টির অপার রহস্য।
মহান স্রষ্টা নারী সৃষ্টির উদ্দেশ্য বর্ণনা করে বলেন, ‘আল্লাহর আরেকটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে’ (সুরা রোম : ২১)।
অনুরূপভাবে স্বামীর দায়িত্ব স্ত্রীর সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা। কর্তৃত্বের ছড়ি না ঘুরিয়ে তার সঙ্গে হাসি-রসিকতার মাধ্যমে সময় কাটানো। তার জৈবিক চাহিদা পূরণ করা। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক ভালো মানুষ তারাই যারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে।’ (তিরমিজি : ১১৬২)
দোষত্রুটি গোপন রাখা
দুনিয়ার সব মানুষ থেকে গোপন থাকলেও স্বামী-স্ত্রীর দোষত্রুটি পরস্পরের কাছে গোপন থাকে না। স্ত্রীর অনেক দুর্বলতার দিক স্বামীর জানা থাকে, আবার স্বামীর অনেক দোষ স্ত্রীর জানা থাকে। কিন্তু উভয়ের উচিত হলো, সব দোষত্রুটি গোপন রাখা।
একান্ত প্রয়োজন হলে এমন ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা যার মাধ্যমে এর সংশোধন সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্বামী-স্ত্রীকে পোশাকের সঙ্গে তুলনা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘নারীরা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা নারীদের পোশাক’ (সুরা বাকারা : ১৮৭)।
পোশাক যেমন দেহের বিভিন্ন অঙ্গ ঢেকে রাখে এবং নানা ক্ষতিকর বস্তু থেকে দেহকে হেফাজত করে, অনুরূপভাবে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে অপরের দোষ ঢেকে রাখবে এবং একে অপরকে গুনাহর কাজ থেকে হেফাজত করবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও/এমকে