ওলামায়ে দেওবন্দের ধারাকে বাংলার রাজনীতি, সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে বাংলাদেশকে বোঝা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ মন্তব্য করেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘ওলামায়ে দেওবন্দের ধারা কোনো হঠাৎ ভেসে আসা বিষয় নয়, কোনো একদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে তৈরি কোনো শক্তিও নয়। এর শিকড় উপমহাদেশের দীর্ঘ ধর্মীয় শিক্ষা, সমাজসংস্কার, ঔপনিবেশিকবিরোধী আন্দোলন এবং মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় রক্ষার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।’
তিনি উল্লেখ করেন, ১৮৬৬ সালে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে এর শিক্ষাব্যবস্থা ও চিন্তার ধারা উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য মাদরাসা ও আলেমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার বহু আলেম দেওবন্দে শিক্ষা গ্রহণ করে ফিরে এসে স্থানীয়ভাবে মাদরাসা, মসজিদ, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। দেওবন্দে শিক্ষিত আলেমরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও মুসলিম সমাজ সংগঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এ ইতিহাস শুধু রাজনীতির ইতিহাস নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সঙ্গে শিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞান, সমাজসংস্কার, দাওয়াহ এবং স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্বের ইতিহাসও যুক্ত।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বর্তমান বাংলাদেশে মসজিদ-মাদরাসা, ওয়াজ-মাহফিল, ধর্মীয় শিক্ষা এবং গ্রামীণ সমাজের নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে এই ধারার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোটি মানুষের ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে যুক্ত এই সামাজিক বাস্তবতাকে শুধু রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের দৃষ্টিতে দেখলে বাংলাদেশের সমাজকে বোঝা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘মসজিদ ও মাদরাসার ভেতরে গিয়ে কাউকে উসকানি দেওয়া, ধর্মীয় মানুষকে অপমান করা কিংবা তাদের বিশ্বাসকে রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার বানানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আলেম, মাদরাসা শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, ছাত্র ও শ্রমিক— সবার মতপ্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ সংগঠনের অধিকার থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে সবার জন্য একই আইন প্রযোজ্য হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
তার ভাষ্য, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কর্মসূচি দমন করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মের নামে সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা মানুষের ওপর হামলাও গ্রহণযোগ্য নয়।
জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে এনসিপির এই নেতা বলেন, বাংলাদেশের কোনো বৃহৎ সামাজিক শক্তিকে বাদ দিয়ে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় হেফাজত, কওমি ও আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন ইসলামপন্থী সামাজিক নেটওয়ার্কের জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, তাদের অবদান অস্বীকার করা যেমন ইতিহাসের প্রতি অবিচার, তেমনি জুলাইয়ের পুরো গণঅভ্যুত্থানকে কোনো একক সংগঠনের অর্জন হিসেবে দেখাও ইতিহাসকে সংকুচিত করা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া উচিত মন্তব্য করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সেখানে আলেম, মুক্তচিন্তার মানুষ, বামপন্থী, জাতীয়তাবাদী, ইসলামপন্থী, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিসহ সবাই থাকবেন। তবে কারও নাগরিক অধিকার অন্যের চেয়ে কম হবে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কাউকে সরিয়ে দেওয়া নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সবাইকে একই রাজনৈতিক মাঠে নিয়ে আসতে হবে।
ওলামায়ে দেওবন্দের ধারার মানুষ বাংলার সমাজে বহুদিন ধরে আছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মসজিদের মিম্বরে, মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে, গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনে এবং মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনে তাদের উপস্থিতি বাস্তব।
তাদের সঙ্গে মতপার্থক্য বা রাজনৈতিক বিরোধ থাকতে পারে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও করা যাবে—তবে মতপার্থক্য মানেই তাদের মুছে ফেলা নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতে, বাংলার মাটিতে যাদের বহু প্রজন্মের সামাজিক শিকড় রয়েছে, তাদের সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সম্মান এবং আইনের সমান প্রয়োগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক অবদান, ধর্মীয় শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে রাষ্ট্রের আরও গভীরভাবে কাজ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাদের কাছ থেকেও দায়িত্বশীল, শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও সহনশীল রাজনৈতিক আচরণের অঙ্গীকার প্রয়োজন।
সবশেষে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কারও একার নয়। এই দেশ আলেমেরও, শ্রমিকেরও; কৃষকেরও, ছাত্রেরও; মাদরাসার শিক্ষার্থীরও, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরও। সংঘাত নয়— সহাবস্থান। উসকানি নয়— সংলাপ। দমন নয়— গণতন্ত্র। বৈষম্য নয়— সমান নাগরিক অধিকার। এটাই নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি হওয়া উচিত।’
সময়ের আলো/কেএইচ