আরও বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে যাচ্ছে সরকার। এবার প্রতি এমএমবিটিইউ (মেট্রিক মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) ২৮ মার্কিন ডলারের বেশি দামে এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
গত ২৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ দশমিক ৬৩ ডলার দরে এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তারও এক সপ্তাহ আগে ১৭ আগস্টের বৈঠকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার দরে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অথচ গত বছরের ডিসেম্বরেও সরকার প্রতি এমএমবিটিইউ সাড়ে ১০ ডলারের কম দামে এলএনজি কিনতে পেরেছিল। ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানে এলএনজির দাম বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে। জানা যায়, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে তিন কার্গো এলএনজি কেনা হবে। এর মধ্যে ২৫ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বরের জন্য ৪৯তম, ১ থেকে ২ অক্টোবরের জন্য ৫০তম এবং ৫ থেকে ৬ অক্টোবরের জন্য ৫১তম কার্গো কেনার প্রস্তাব রয়েছে।
তিন কার্গোর জন্য পৃথক তিনটি প্রতিষ্ঠানের দর সুপারিশ করা হয়েছে। ৪৯তম কার্গোর জন্য আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুরের দর প্রতি এমএমবিটিইউ ২৭ দশমিক ৫৪ মার্কিন ডলার। ৫০তম কার্গোর জন্য বিপি সিঙ্গাপুরের দর প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক শূন্য ৩ মার্কিন ডলার। আর ৫১তম কার্গোর জন্য ভিটল এশিয়া পিটিই লিমিটেড, সিঙ্গাপুরের দর প্রতি এমএমবিটিইউ ২৬ দশমিক ৬৬৮৮ মার্কিন ডলার।
অন্যদিকে জিটুজি ভিত্তিতে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর ও পেট্রোবাংলার মধ্যে স্বাক্ষরিত স্বল্পমেয়াদি এলএনজি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত পরিমাণ হিসেবে আরও এক কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এ কার্গোটি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩ দশমিক ৯৮ মার্কিন ডলার দরে এ এলএনজি কেনা হবে। বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের উত্থাপিত উভয় প্রস্তাবই অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়।
বান্দরবানে ৩৮৪ কোটি টাকায় হবে তিন সড়ক নির্মাণ-উন্নয়ন : এদিকে বান্দরবানে হোস্ট কমিউনিটির জন্য তিনটি সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের দুটি প্যাকেজের পূর্ত কাজের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। দুই প্যাকেজের কাজ বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে প্রায় ৩৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে একটি প্যাকেজে ব্যয় হবে ১৯৩ কোটি ৮৪ লাখ ১৩ হাজার ২৮ টাকা এবং অন্যটিতে ১৯০ কোটি টাকা।
অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী ‘বান্দরবান সড়ক বিভাগের অধীনে হোস্ট কমিউনিটির জন্য ৩টি সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্যাকেজ নম্বর পিডব্লিউ-৪ এর পূর্ত কাজের জন্য ব্যয় হবে ১৯৩ কোটি ৮৪ লাখ ১৩ হাজার ২৮ টাকা। এ অর্থের মধ্যে রয়েছে সরকারি উন্নয়ন বাজেট ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন। এই কাজ বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব জমা দেয়। তিনটি প্রস্তাবই কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। দরপত্রের সব প্রক্রিয়া শেষে কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, ঢাকার কাছ থেকে ভ্যাট ও করসহ মোট ১৯৩ কোটি ৮৪ লাখ ১৩ হাজার ২৮ টাকায় কাজটি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
এই প্যাকেজের আওতায় নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়া থেকে লামা গজারিয়া পর্যন্ত ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার সড়কে বিভিন্ন উন্নয়নকাজ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ৮৩ হাজার ১০৯ দশমিক ৫১ ঘনমিটার মাটির কাজ, ১৮ ফুট প্রশস্ত ৮ দশমিক ২৪৭ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ ও ডিবিএস সারফেসিং, ১২টি সেতু এবং ১৮টি কালভার্ট নির্মাণ।
মরক্কো থেকে ৭০ হাজার টন সার কিনবে সরকার : একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা ও কৃষকদের চাহিদা মেটাতে মরক্কো থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি ও টিএসপি সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি এবং ৩০ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি সার রয়েছে। দুই ধরনের সার আমদানিতে মোট ব্যয় হবে ৬৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি পর্যায়ে চুক্তির আওতায় মরক্কো থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের মাধ্যমে এ সার আমদানি করা হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি মেট্রিক টন ডিএপি সারের দাম পড়বে ৮৯৪ মার্কিন ডলার। ৪০ হাজার মেট্রিক টন সারের মোট মূল্য ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৪০ কোটি ৯২ লাখ ৮ হাজার টাকা। কৃষি ভর্তুকির বাজেট থেকে এ অর্থ পরিশোধ করা হবে।
মরক্কো থেকে সরকারি পর্যায়ে ডিএপি সার আমদানির আগের চুক্তির কার্যক্রম শেষ হওয়ায় গত ২৫ জুন নতুন করে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। ওই চুক্তিতে নির্ধারিত মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অনুযায়ী বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে এবারের ডিএপি সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মরক্কো থেকে ৫ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এরই মধ্যে দেশটি থেকে ২ লাখ মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানি করা হয়েছে। নতুন করে ৪০ হাজার টন আমদানির অনুমোদন দেওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরবরাহ আরও বাড়বে।
একই বৈঠকে সরকারি পর্যায়ে চুক্তির আওতায় মরক্কো থেকে আরও ৩০ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এটি হবে চুক্তির সপ্তম লটের সার আমদানি।
৩০ হাজার মেট্রিক টন টিএসপি সার আমদানিতে মোট ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ৫৯ হাজার ৬৬০ টাকা। প্রতি মেট্রিক টন টিএসপি সারের দাম পড়বে ৬৬৯ দশমিক ৩৩ মার্কিন ডলার। এ ক্ষেত্রেও মরক্কোর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহকারী হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে।
৪৪৫ কোটি টাকার তেল-ডাল কিনছে সরকার : এ ছাড়া নিম্নআয়ের এক কোটি পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির জন্য ২ কোটি লিটার পরিশোধিত পাম অলিন ও ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে মোট ব্যয় হবে ৪৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ২ কোটি লিটার পরিশোধিত পাম অলিন কেনা হবে। প্রতি লিটার ১৮৩ টাকা ৮৫ পয়সা দরে এ তেল কিনতে মোট ব্যয় হবে ৩৬৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পরিবহন খরচসহ টিসিবির গুদাম পর্যন্ত তেল সরবরাহ করবে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ঢাকা।
টিসিবির কার্ডধারী এক কোটি নিম্নআয়ের পরিবারের কাছে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রির লক্ষ্যে এ তেল কেনা হচ্ছে। ক্রয়ের অর্থের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাল্টা নিশ্চয়তা রয়েছে। জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিসিবির ভোজ্য তেল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২২ কোটি লিটার। এরই মধ্যে ৮৪ লাখ ১ হাজার ৮০২ লিটার ভোজ্য তেল কেনা হয়েছে।
অন্যদিকে একই বৈঠকে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রতি কেজি ৭৭ টাকা ৯০ পয়সা দরে এ ডাল কিনতে মোট ব্যয় হবে ৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে